কবিতা

হে হিরণ্ময়

ভয়ে ভয়ে সারাদিন কেটে যায় ; এমন কি ইদানীং
উপবিষ্ট হতে ভয় লাগে, কেননা তেমন অনুগত,
বিশ্বস্ত চেয়ার আর কখনো দেখি না কারো
করতলগত হ’য়ে পোষ-মানা বাঘের মতন ব’সে আছে,
তেমনি নির্ভরযোগ্য টুল — কিম্বা বেঞ্চি নেই যেখানে আমার
পাঁচ ফুট ন ই’ইঞ্চি শরীর খুব সাবলীলভাবে দু’দণ্ড জিরোবে,
এমন আসন পাবে যার পাশে অন্তত থাকতে পারে
আমার সন্তান কিম্বা একরাশ তারা-পোরা সন্ধ্যার শহর
অথবা অত্যন্ত উঁচু মঞ্চ কোনো অনায়াসে এঁটে যায়—এমন চেয়ার—
যেখানে মাইক্রোফোনে সারাদিন তরুণ কবির কন্ঠ
যথার্থ অরুণোদয়ে ভ’রে দেবে আমাদের তামস হৃদয় ;
তেমন উল্লেখযোগ্য, জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের উপাদানে গ’ড়ে-ওঠা
হিরণ্ময় চেয়ার কোথাও কোনোদিন আমি পাবো নাকি!
একদা যেমন একবার পেয়েছিলাম অসীম লাবণ্যে-ভরা
সমুদ্র-সংলগ্ন এক সোনালি চেয়ার — ছিলো না হাতল,
একরোখা চুম্বনের মতো তবু তাকে আমি সরাতে পারি নি
ঠোঁটের কিনারা থেকে, নীলাভ শৈশবে সে আমার অদম্য জাহাজ।
আমাকে ফিরিয়ে দাও সেই সাবলীল সমুদ্রের বিহ্বল জাহাজ,
সেই জাহাজের রাত্রিময় ডেকে হীরে-জ্বলা একাকী চেয়ার
আমি আরো একবার বাতাসে উড়িয়ে চুল উপবিষ্ট হ’তে চাই।।

শহীদ কাদরী
শহীদ কাদরী
জন্ম: ১৪ই আগস্ট, ১৯৪২ বাংলাদেশের একজন কবি ও লেখক। তিনি ১৯৪৭-পরবর্তীকালের বাংলা সংস্কৃতির বিখ্যাত কবিদের একজন যিনি নাগরিক-জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়ন করে নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করে বাংলা কবিতায় সজীব বাতাস বইয়ে দিয়েছেন। তিনি আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যের তীক্ষ্ণ শাণিত রূপ তাঁর কবিতাকে বৈশিষ্ট্য দান করেছে। শহর এবং তার সভ্যতার বিকারকে শহীদ কাদরী ব্যবহার করেছেন তাঁর কাব্যে। তাঁর কবিতায় অনূভূতির গভীরতা, চিন্তার সুক্ষ্ণতা ও রূপগত পরিচর্যার পরিচয় সুস্পষ্ট।কবি শহীদ কাদরী ৭৮ সালের পর থেকেই বাংলাদেশের বাইরে। জার্মান, ইংল্যান্ড হয়ে তিনি এখন আমেরিকায় পাকাপাকিভাবে বসবাস করছেন। পঞ্চাশ উত্তর বাংলা কবিতা ধারায় আধুনিক মনন ও জীবনবোধ সৃষ্টিতে যে কজন কবির নাম করা যায় কবি শহীদ কাদরী ছিলেন তাঁদের মাঝে অন্যতম। বিশ্ব-নাগরিকতা বোধ, আধুনিক নাগরিক জীবনের সুখ-দুঃখ, রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটকৌশল এসব কিছুই তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে স্বতস্ফূর্তভাবে। উত্তরাধিকার, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা এবং কোথাও কোন ক্রন্দন নেই এই তিনটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ দিয়ে কবি শহীদ কাদরী বাংলার কবিতায় একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত ঝলসে উঠে কবি যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ঠিক তখনি লেখালেখির জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ইউরোপ পাড়ি জমালেন। বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে কবি তাঁর ঠিকানাটি বেছে নিলেও দেশ থেকে বয়ে নিয়ে আসা স্মৃতিগুলো সবসময় তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকে, এক ধরনের নস্টালজিক আবেগ তাড়িত করে বেড়ায় ।