কবিতা

কিন্তু, আরো কতোদিন

অনুবাদঃ শক্তি চট্টোপাধ্যায়
বস্তুত, একটা মানুষ কতোদিন বাঁচে?
হাজার দিন? না, শুধু একটি দিন?
এক সপ্তাহ? না কয়েক শতাব্দী?

কতোদিন পর্যন্ত একটা মানুষ মরতে খরচ করে?
কী মানে হয় ‘চিরকালের জন্য’ কথাটার?

এইসব ভাবনা-চিন্তার ভেতর গড়াতে-গড়াতে
আমি আশপাশটা পরিষ্কার করবো বলে ঠিক করে ফেললাম।

আমি খুঁজে বের করলাম জ্ঞানীগুণী পুরুতমশাইদের,
তাদের পুজোপাঠ শেষ হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য অপেক্ষা করলাম,
আমি দেখতে থাকলাম তাদের এবং তারা তাদের পথে চলে গেলো
ভগবান এবং শয়তানের সঙ্গে দেখা করতে।

আমার প্রশ্নে ওরা ক্লান্ত হচ্ছিলো।
প্রকৃতপক্ষে ওরা খুব কম জানে;
তারা প্রশাসক ছাড়া বেশি কিছু নয়।

চিকিৎসাবিদেরা আমায় অভ্যর্থনা করলো
সাক্ষাৎকারের মধ্যে
প্রতিটি হাতে গ্লাভস
অরিওমাইসিনে ঠাসা—
প্রতিটি দিনই ব্যস্ততা বাড়ছে।
যতোদূর পর্যন্ত আমি ওদের কথা থেকে বুঝেছি,
সমস্যাটা এরকমঃ
অনু প্রসারণ খুব বড়ো কথা নয়—
তারা আরো ভারি কিছু নিয়ে আলোচনা করছিলো—
সামান্য যা কিছু থাকলো কুড়িয়ে- বাঁচিয়ে
বিকলাংগতার চিহ্ন দেখা গেলো তাদের মধ্যে।
তারা আমায় এমন চমকে দিয়ে গেলো যে আমি
কবর-খুঁড়িয়েদের খুঁজে বেড়াতে থাকলাম।
আমি নদীর কাছে চলে গেলাম, যেখানে তারা পোড়ায়
বিশাল রংদার মৃতদেহগুলি
আর তাদের শক্তসমর্থ হাড়।
উপকূলভূমি জুড়ে পড়ে আছে
মৃত আর ছাই-হয়ে যাওয়া বিশেষজ্ঞের দল।

যখন আমি একটা সুযোগ পেলাম
আমি প্রশ্ন করলাম তাদের।
তারা আমাকে পুড়িয়ে ফেলতে চাইল;
এই একটি ব্যাপারই তারা ভালোরকম জানে।

আমার নিজের দেশের কর্মবীরের দল
উত্তর করলো, মদ খেতে-খেতে;
‘একটা ভালো দেখে মেয়েমানুষ জুটিয়ে ফ্যালো।
আর এসব বুজরুকি ছাড়ো।’

আমি এতো সুখী মানুষ কখনো দেখিনি।

তাদের গেলাস তুলে, তারা গান গাইতে লাগলো
স্বাস্থ্য ও মৃত্যুর জন্য অভিবাদন জানিয়ে
তারা একদল পাজি ছুঁচো।

আমি বাড়ি ফিরলাম, বিশ্বপরিক্রমা শেষে
বয়স বাড়িয়ে।

এখন আর কাউকে প্রশ্ন করি না।
প্রতিদিনই আমি খুব কম করে জানছি।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
শক্তি চট্টোপাধ্যায় (জন্ম নভেম্বর ২৫, ১৯৩৪ - মৃত্যু মার্চ ২৩, ১৯৯৫) বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ - উত্তর যুগের একজন প্রধান লিরিক কবি । পারিবারিক পরিচয়ঃ শক্তি চট্টোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের জয়নগর - মজিলপুরের দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । দারিদ্রের কারণে তিনি স্নাতক পাঠ অর্ধসমাপ্ত রেখে প্রেসিডেন্সি কলেজ ছাড়েন, এবং সাহিত্যকে জীবিকা করার উদ্দৈশ্যে উপন্যাস লেখা আরম্ভ করেন । প্রথম উপন্যাস লেখেন কুয়োতলা । কিন্তু কলেজ - জীবনের বন্ধু সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বনাঞ্চল - কুটির চাইবাসায় আড়াই বছর থাকার সময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় একজন সফল লিরিকাল কবিতে পরিণত হন । একই দিনে বেশ কয়েকটি কবিতা লিখে ফেলার অভ্যাস গড়ে ফেলেন তিনি । শক্তি নিজের কবিতাকে বলতেন পদ্য । হাংরি আন্দোলনঃ ১৯৬১ সালের নভেম্বরে ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে যে চারজন কবিকে হাংরি আন্দোলন - এর জনক মনে করা হয় তাঁদের মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় অন্যতম । অন্য তিনজন হলেন সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায় এবং মলয় রায়চৌধুরী । শেষোক্ত তিনজনের সঙ্গে সাহিত্যিক মতান্তরের জন্য ১৯৬৩ সালে তিনি হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীতে যোগ দেন । তিনি প্রায় ৫০টি হাংরি বুলেটিন প্রকাশ করে ছিলেন । পরবর্তীকালে কৃত্তিবাসের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধধ্যায়ের নাম সাহিত্যিক মহলে একত্রে উচ্চারিত হতো , যদিও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলন এর ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং কৃত্তিবাস পত্রিকায় ১৯৬৬ সালে সেই মনোভাব প্রকাশ করে সম্পাদকীয় লিখে ছিলেন । পুরস্কারঃ সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার সহ তিনি একাধিক পুরস্কারে সন্মানিত ।