কবিতা

বাড়ি যাবে, সুরঞ্জন?

তোমাদের ধোবাউড়া এখনও আগের মতো গ্রাম
সেই যে একটি চারা রোপেছিলে মাঠে, নীলাদ্রিদের বাগান ঘেঁষে, সেই চারা
বড় হতে হতে শেকড় ছড়িয়ে বড় এক বৃক্ষ হয়ে গেছে,
সোনালি ধানের গ্রাম, সোনালি আঁশের__
তোমাদের ধোবাউড়া
বাঁশঝাড়ের ভূতের ভয়ে সন্ধেয় ঘুমিয়ে পড়ে, এখনও সে
খুব ভোরে শিশিরকণার মতো খেলা করে সবুজ পাতায়, ফুলে

বাড়িটি আগের মতো আছে, গাছগুলো শরীরে বেড়েছে
সুপুরির বাগান, উঠোনে আম জাম লিচু কাঁঠালের সারি।
চুন-সুরকির আগের খিলান সেই
সেই কড়িকাঠ
শ্যাওলা জমেছে শুধু ঘাটলায়, নিকোনো উঠোনটিতে দূর্বা
তোমাদের বাড়ি, তোমাদের পিতার, পিতামহ, প্রপিতামহের বাড়ি
যাবে সুরঞ্জন?

ঝিঁঝিঁ ডাকে এখনও, এখনও ঝোপঝাড় থেকে হঠাৎ হঠাৎ
উঁকি দেয় ধাবমান হরিণের দ্যুতি
পাহাড় গড়িয়ে নামে আষাঢ়ের জল, ডালে বসে
কাক ভেজে, ভেজে উলঙ্গ উন্মূল শিশু, নদীতে ঝাঁপিয়ে খেলে,
মাছ ধরে, বাড়ি যাবে, সুরঞ্জন?

তোমার নিজের বাড়ি, কাঁঠালিচাঁপার ঘ্রাণ, চেনা পথ, হাডুডুর মাঠ
ছেলেবেলার ইস্কুল, যাবে?

কতকাল পরবাসে আছ,
এবার গঙ্গার জলে সব অভিমান ধুয়ে বাড়ি ফেরো, সুরঞ্জন।

তসলিমা নাসরীন
তসলিমা নাসরীন
তসলিমা নাসরিন (জন্ম: ২৫ আগস্ট, ১৯৬২) বাংলাদেশের একজন সাহিত্যিক ও চিকিৎসক। বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে একজন উদীয়মান কবি হিসেবে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করে তসলিমা এই শতকের শেষের দিকে নারীবাদী ও ধর্মীয় সমালোচনামূলক রচনার কারণে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন। তিনি তাঁর রচনা ও ভাষণের মাধ্যমে লিঙ্গসমতা, মুক্তচিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ ও মানবাধিকারের প্রচার করায় ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীদের রোষানলে পড়েন ও তাঁদের নিকট হতে হত্যার হুমকি পেতে থাকায় ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ ত্যাগ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করতে বাধ্য হন;তিনি কিছুকাল যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন।