কবিতা

যাই, যাই

আজ আবার আমার ইচ্ছা হলো যাই
বর্ধমানে, সেই একটুখানি ইস্টিশনে,
হাই তুলতে তুলতে যাই বটগ্রামে শিউলিতলায়
যেখানে দাঁড়িয়ে আমি কোনওদিন ফটোগ্রাফ তুলি নাই
হে আমার মোরগের চোখের মতন খুব ছেলেবেলা !

চলো তাকে তুলে আনি, তবু বলো
আগে কেন আনি নাই ? অথচ স্বপ্নের মধ্যে
শিউলি-গাছের মতো আমার মা দারুন সুগন্ধ
সঙ্গে নিয়ে একনও দাঁড়িয়ে টান দেন কনিষ্ঠ আঙুল।
কপিকলে উঠে-আসা মধ্যাহ্নে কুয়োর ঠাণ্ডা পানি
আমাকে আবার তুলে দ্যায় নতুন শরীর ধরে
সেই সুপ্রাচীন সাঁওতাল। তার ছবি নেই কেন
এ্যালবামে ? সে কি শিমুলের মতো উড়ে
চলে গেছে শালবনে ? কণ্ঠ তার মহুয়ায়
মাদলের বোলে, জন্মে-জন্মে, অন্য কোনও জন্মান্তরে
জাগ্রত হবে না আর ? যদি হয়, আজ তাই
যা কিছু এড়িয়ে গেছি, আড়ালে রেখেছি
আমার নিজের মধ্যে, কবিতার ক্লান্ত শব্দে, বারবার
ফিরিয়ে আনতে চাই। আজ আবার আমার
ইচ্ছে হলো যাই, এই রঙ-বেরঙের শার্ট-জামা-জুতো,
মাছ থেকে মাছের আঁশের মতো কৌশলে ছাড়াই … যাই …

একটি নতুন নম্র বীজ হয়ে, বকুল অথবা
চামেলীর ছদ্মবেশে এক্কেবারে শব্দহীন চলে যাই

শহীদ কাদরী
শহীদ কাদরী
জন্ম: ১৪ই আগস্ট, ১৯৪২ বাংলাদেশের একজন কবি ও লেখক। তিনি ১৯৪৭-পরবর্তীকালের বাংলা সংস্কৃতির বিখ্যাত কবিদের একজন যিনি নাগরিক-জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়ন করে নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করে বাংলা কবিতায় সজীব বাতাস বইয়ে দিয়েছেন। তিনি আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যের তীক্ষ্ণ শাণিত রূপ তাঁর কবিতাকে বৈশিষ্ট্য দান করেছে। শহর এবং তার সভ্যতার বিকারকে শহীদ কাদরী ব্যবহার করেছেন তাঁর কাব্যে। তাঁর কবিতায় অনূভূতির গভীরতা, চিন্তার সুক্ষ্ণতা ও রূপগত পরিচর্যার পরিচয় সুস্পষ্ট।কবি শহীদ কাদরী ৭৮ সালের পর থেকেই বাংলাদেশের বাইরে। জার্মান, ইংল্যান্ড হয়ে তিনি এখন আমেরিকায় পাকাপাকিভাবে বসবাস করছেন। পঞ্চাশ উত্তর বাংলা কবিতা ধারায় আধুনিক মনন ও জীবনবোধ সৃষ্টিতে যে কজন কবির নাম করা যায় কবি শহীদ কাদরী ছিলেন তাঁদের মাঝে অন্যতম। বিশ্ব-নাগরিকতা বোধ, আধুনিক নাগরিক জীবনের সুখ-দুঃখ, রাষ্ট্রযন্ত্রের কূটকৌশল এসব কিছুই তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে স্বতস্ফূর্তভাবে। উত্তরাধিকার, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা এবং কোথাও কোন ক্রন্দন নেই এই তিনটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ দিয়ে কবি শহীদ কাদরী বাংলার কবিতায় একটি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত ঝলসে উঠে কবি যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ঠিক তখনি লেখালেখির জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ইউরোপ পাড়ি জমালেন। বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে কবি তাঁর ঠিকানাটি বেছে নিলেও দেশ থেকে বয়ে নিয়ে আসা স্মৃতিগুলো সবসময় তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকে, এক ধরনের নস্টালজিক আবেগ তাড়িত করে বেড়ায় ।