কবিতা

শান্তির ডিক্রি


নিজের হাতে জমি চাষ করেন এমন একজন সাধারণ

কৃষককে জিজ্ঞেস করুন, আপনি কি চান শান্তি?

তাঁর উত্তর হবে: এই তো আমার সবচেয়ে প্রিয় চাওয়া।

চাই, প্রাণপণে চাই, শতমুখে চাই।

জিজ্ঞেস করুন কারখানার একজন সাধারণ শ্রমিককে,

আপনি কী চান? তারও উত্তর হবে – শান্তি ….

একটু শান্তির জন্যই তো এই অহোরাত্র শ্রম।

জিজ্ঞেস করুন একটি বনের পাখিকে, সে-ও বলবে, শান্তি….

অবশ্য যুদ্ধবাজরা বলতে পারেন, পাখিটি অন্য কথা বলেছে।

জিজ্ঞেস করুন অরণ্যের যে কোন বৃক্ষকে, সম্ভাব্য

পরমাণু যুদ্ধের মোকাবিলায় সে প্রস্তুত আছে কিনা?

পাতা নাড়িয়ে, আপ্রাণ প্রয়াসে সে বলে উঠবে না, না, না, ..।

নদীর জল ও আকাশের মেঘপঞ্জকে জিজ্ঞেস করুন,

হিরোশিমার পরমানু – ভস্মের দগ্ধ স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি।

কৃষক-শ্রমিক, পাখি-পতঙ্গ, বৃক্ষ-নদী-মেঘ,

সবাই আজ যুদ্ধের বিরুদ্ধে সমবেত শান্তির মিছিলে।

যুক্তরাষ্ট্রে,

ইউরোপে,

এশিয়ায়,

আফ্রিকায়,

ল্যাটিনে,

– কোথায় নয়?

যেখানে মিসাইল সেখানেই শান্তির কপোত।

এবার জিজ্ঞেস করুন লাখ-লাখ একর জমির মালিকদের,

অঢেল খাদ্য ফলিয়ে বিশ্বের খাদ্য-বাজারকে

যারা নিয়ন্ত্রন করতে চায়; খাদ্যকে যারা রূপান্তরিত করে অস্ত্রে।

জিজ্ঞেস করুন বড়-বড় শিল্প-কারখানার সেইসব মালিকদের,

যারা তাদের উৎপন্ন সামগ্রীর চকবাজার বলে ভাবেন

এই বুভূক্ষ পৃথিবীকে __________;

যারা পৃথিবীজুড়ে চান শোষণের জাল বিস্তার করতে।

পৃথিবীর মোট-সম্পদের সিংহভাগ যাদের কুক্ষিগত,

জিগজ্ঞস করুন সেই দুইশ পরিবারের বড়-কর্তাদের:

রকফেলার,

ম্যাক-ডোনাল্ড,

লক-হিড…

কী সুন্দর একগুচ্ছ থোকা থোকা নাম।

ক্ষীণকন্ঠে হয়তো তারাও বলবেন শান্তির কথা,

নির্মলেন্দু গুন
নির্মলেন্দু গুন
জন্ম: জুন ২১, ১৯৪৫ (আষাঢ় ৭, ১৩৫২ বঙ্গাব্দ), কাশবন, বারহাট্টা, নেত্রকোণা বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিদেরও একজন তিনি। মাত্র ৪ বছর বয়সে মা বীনাপনিকে হারান তিনি ৷ মা মারা যাবার পর তাঁর বাবা আবার বিয়ে করেন৷ শিক্ষাজীবন বারহাট্টা স্কুলে ভর্তি হন শুরুতে৷ স্কুলের পুরো নাম ছিলো করোনেশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইন্সটিটিউট। দুই বিষয়ে লেটারসহ মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ পান ১৯৬২ সালে৷ মাত্র ৩ জন প্রথম বিভাগ পেয়েছিল স্কুল থেকে৷ বাবা তাঁর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন- “কৃষ্ণ কৃপাহি কেবলম। মেট্রিক পরীক্ষার আগেই নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণের প্রথম কবিতা ‘নতুন কান্ডারী’৷ মেট্রিকের পর আই.এস.সি পড়তে চলে আসেন ময়মনসিংহেরআনন্দমোহন কলেজে৷ মেট্রিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের সুবাদে পাওয়া রেসিডেন্সিয়াল স্কলারশিপসহ পড়তে থাকেন এখানে৷ নেত্রকোণায় ফিরে এসে নির্মলেন্দু গুণ আবার ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকা ও তাঁর কবি বন্ধুদের কাছে আসার সুযোগ পান৷ নেত্রকোণার সুন্দর সাহিত্যিক পরিমন্ডলে তাঁর দিন ভালোই কাটতে থাকে৷ একসময় এসে যায় আই.এস.সি পরীক্ষা৷ ১৯৬৪ সালের জুন মাসে আই.এস.সি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডের ১১৯ জন প্রথম বিভাগ অর্জনকারীর মাঝে তিনিই একমাত্র নেত্রকোণা কলেজের৷ পরবর্তীতে বাবা চাইতেন ডাক্তারী পড়া৷ কিন্তু না তিনি চান্স পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগে৷ ভর্তির প্রস্তুতি নেন নির্মলেন্দু গুণ ৷ হঠাত্‍ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয় ঢাকায়৷ দাঙ্গার কারণে তিনি ফিরে আসেন গ্রামে৷ ঢাকার অবস্থার উন্নতি হলে ফিরে গিয়ে দেখেন তাঁর নাম ভর্তি লিষ্ট থেকে লাল কালি দিয়ে কেটে দেওয়া৷ আর ভর্তি হওয়া হলো না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ ফিরে আসেন গ্রামে৷ আই.এস.সি-তে ভালো রেজাল্ট করায় তিনি ফার্স্ট গ্রেড স্কলারশিপ পেয়েছিলেন৷ মাসে ৪৫ টাকা, বছর শেষে আরও ২৫০ টাকা৷ তখনকার দিনে অনেক টাকা৷ ১৯৬৯ সালে প্রাইভেটে বি.এ. পাশ করেন তিনি ( যদিও বি.এ. সার্টিফিকেটটি তিনি তোলেননি। ১৯৬৫ সালে আবার বুয়েটে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন৷কর্মজীবনঃ স্বাধীনতার পূর্বে তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সাংবাদিকতায়ও জড়িত ছিলেন।সাহিত্য ধারাঃ তিনি প্রধানত একজন আধুনিক কবি। শ্রেণীসংগ্রাম, স্বৈরাচার-বিরোধিতা, প্রেম ও নারী তার কবিতার মূল-বিষয় হিসেবে বার বার এসেছে। কবিতার পাশাপাশি ভ্রমণ কাহিনীও লিখেছেন। নিজের লেখা কবিতা এবং গদ্য সম্পর্কে তার নিজের বক্তব্য হলো - “ অনেক সময় কবিতা লেখার চেয়ে আমি গদ্যরচনায় বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। বিশেষ করে আমার আত্মজৈবনিক রচনা বা ভ্রমণকথা লেখার সময় আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে আমি যে গদ্যটি রচনা করতে চলেছি, তা আমার কাব্য-রচনার চেয়ে কোনো অর্থেই ঊনকর্ম নয়। কাব্যকে যদি আমি আমার কন্যা বলে ভাবি, তবে গদ্যকে পুত্রবৎ। ওরা দুজন তো আমারই সন্তান। কাব্যলক্ষ্মী কন্যা যদি, গদ্যপ্রবর পুত্রবৎ। ” বহুল আবৃত্ত কবিতাসমূহের মধ্যে - হুলিয়া, অসমাপ্ত কবিতা, মানুষ (১৯৭০ প্রেমাংশুর রক্ত চাই), আফ্রিকার প্রেমের কবিতা (১৯৮৬ নিরঞ্জনের পৃথিবী) - ইত্যাদি অন্যতম।