কবিতা

আমি ছিন্নভিন্ন

আমি ছিন্নভিন্ন-বিগত বছরের এটাই সর্বাপেক্ষা
প্রধান সংবাদ
বিশ্বের সমস্ত প্রচার মাধ্যম থেকে একযোগে প্রচারযোগ্য
এই একটাই বিশ্বসংবাদ, আমি ছিন্নভিন্ন
যদিও একান্ত ব্যক্তিগত এই শোকবার্তা কারো মনে
জাগাবে না সামান্য করুণা
তবু মনে হয় এই শতাব্দীর এটাই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ
একটি সংবাদ-শিরোনাম : আমি ছিন্নভিন্ন ;
এই কবিতার মদ্যে আমি এই একান্ত জরুরী খবরটাই শুধু
উদ্ধৃত করেছি
শিম্ভের সমস্ত সংবাদ উৎস হতে এই একটাই বার্তা শুধু
প্রচারিত হচ্ছে একটি শতাব্দী ধরে-
মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখো, তার বুকের কাছে মুখ নিয়ে
জিজ্ঞেস করো সে বলবে, আমি ছিন্নভিন্ন
গোলাপের দিকে তাকাও সে বলবে, আমি ছিন্নভিন্ন
বন কিংবা উদ্ভিদের কছে যাও সেও এই একই কথাই বলবে,
অনন্ত নীলিমার দিক চোখ ফেরাও তার কন্ঠে শুনতে পাবে
এই একই ভয়াবহ বার্তা ; আমি ছিনইভন্ন
পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে ফিরে তাকাও
সেও ক্রমাগত আর্তনাদ করে উঠবে, আমি ছিন্নভিন্ন
সৌন্দর্যকে জিজ্ঞেস করো সেও এই একই উত্তর দেবে,
মানুষের শুদ্ধতাকে প্রশ্ন করো সেও নিঃসঙ্কোচে
বলবে, আমি ছিন্নভিন্ন
প্রকৃতি ও শস্যক্ষেত্রের কাছে যাও অন্য কিচুই শুনতে পাবে না,
এমন যে শান্ত জলধারা তার কাছেও যাও
আহত কন্ঠে বলবে সেও দলিত-মথিত, ছিন্নভিন্ন
গোলাপের কৌমার্য, ফুলের শুদ্ধতা আর হৃদয়ের বিশুদ্ধ আবেগ
তারাও এই একই কথা বলবে ;
দেশ ছিন্নভিন্ন, মানুষ ছিন্নভিন্ন,মানুষের সত্তা ছিন্নভিন্ন
যতোই লুকোতে চাই তবুও প্রকৃত সত্য হচ্ছে
আমি ছিন্নভিন্ন,কাঁটায় কাঁটায় বিদ্ধ ও বিক্ষত
ট্রাজিডির করুণ নয়ক যেন চোখের সম্মুখে দেখে
একে একে নিভিছে দেউটি, অগ্নিদগ্ধ স্বর্ণলঙ্কাপুরী
মুহূর্তে বিরান এই সমগ্র জীবন,
হয়তো সম্মুখ যুদ্ধে হইনি আক্রান্‌ক
ভূমিকম্প কিংবা ঘূর্ণিঝড় তছনছ করেনি উদ্যান,
তবুও তাকিয়ে দেখি আমি যেন ধ্বংসস্তপ
এর ব্যক্তিগত শোকবর্তা যদিও কারোই মনে
বিশেষ চাঞ্চল্য কিছু জাগাবে না ঠিক
তবুও যেমন একটি গোলাপ বলে, একটি উদ্ভিদ বলে,
এই দেশ বলে, মানুষের সত্তার শুদ্ধতা বলে
আমিও তেমনি বলি সব চেয়ে সত্য আর মর্মান্তিক একটি সংবাদ ;
আমি ছিন্নভিন্ন-
আমার সমস্ত সত্তা ছিন্নভিন্ন, ছিন্নভিন্ন আমার শরীর
ছিন্নভিন্ন, তবুও দাঁড়িয়ে আছি।

মহাদেব সাহা
মহাদেব সাহা
(জন্ম: ৫ আগস্ট ১৯৪৪) বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালের একজন অন্যতম প্রধান কবি।১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট পাবনা জেলার ধানঘড়া গ্রামে পৈতৃক বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বগদাধর সাহা এবং মাতা বিরাজমোহিনী।তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৯৩ টি। কাব্যগ্রন্থ এই গৃহ এই সন্ন্যাস (১৯৭২), মানব এসেছি কাছে, চাই বিষ অমরতা, কী সুন্দর অন্ধ, তোমার পায়ের শব্দ, তবু স্বপ্ন দেখি, সোনালী ডানার মেঘ, পৃথিবী তোমাকে আমি ভালোবাসি, কে পেয়েছে সব সুখ, সবটুকু মধু,, শুকনো পাতার স্বপ্নগাঁথা, দুঃসময়ের সঙ্গে হেঁটে যাই, দুঃখ কোন শেষ কথা নয়, ভালোবাসা কেন এতো আলো অন্ধকারময়, লাজুক লিরিক-২, দূর বংশীধ্বনি, অর্ধেক ডুবেছি প্রেমে - অর্ধেক আধারে, কালো মেঘের ওপারে পূর্ণিমা, সন্ধ্যার লিরিক ও অন্যান্য, মহাদেব সাহার রাজনৈতিক কবিতা (কাব্য-সংকলন), মহাদেব সাহার প্রেমের কবিতা (কাব্য-সংকলন), মহাদেব সাহার কাব্যসমগ্র (কাব্য-সংকলন) - ১ম খণ্ড, ২য় খন্ড, ৩য় খন্ড, ৪র্থ খন্ড, মহাদেব সাহার শ্রেষ্ঠ কবিতা (কাব্য-সংকলন), প্রেম ও ভালবাসার কবিতা (কাব্য-সংকলন), নির্বাচিত ১০০ কবিতা (কাব্য-সংকলন), নির্বাচিত একশ (কাব্য-সংকলন), প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতা(কাব্য-সংকলন), প্রবন্ধ আনন্দের মৃত্যু নেই মহাদেব সাহার কলাম কবিতার দেশ ও অন্যান্য ভাবনা মহাদেব সাহার নির্বাচিত কলাম শিশুসাহিত্য টাপুর টুপুর মেঘের দুপুর ছবি আঁকা পাখির পাখা আকাশে ওড়া মাটির ঘোড়া সরষে ফুলের নদী আকাশে সোনার থালা মহাদেব সাহার কিশোর কবিতা পুরস্কার ও সম্মাননা --------------------------------- মহাদেব সাহা তাঁর কাব্য প্রতিভার জন্য অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি ১৯৮৩ সালে কবিতায় বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়াও অন্যান্য পুরস্কার ও সম্মননার মধ্যে ১৯৯৫ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার, ২০০২ সালে খালেদদাদ চৌধূরী স্মৃতি পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার অন্যতম।