বিকেলের বেহাগ

bikeler behag-1ছয়
শুক্রবার, ছুটির দিন। নাস্তার পর কাগজ পড়ছিলেন এনায়েতুল্লা খান। দাউদ ফোনে কথা বলছে। জয়নাব আমেনার মাকে দুপুরে কি রান্না হবে তা বলে দিচ্ছে।রাজু ঘর পরিষ্কার করছে। ড্রাইভার সালাম আর দারোয়ান বরকতের মধ্যে তর্কের মতো কথা শোনা যাচ্ছে বাইরে। কাগজ পড়া থেকে মুখ তুলে তিনি বিরক্তির সঙ্গে বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ওরা
দু’জন এত জোরে কথা বলছে কেন? দেখত রাজু, কি ব্যাপার। ওদের আস্তে কথা বলতে বল। আমি কাগজ পড়তে পারছি না।
রাজু ঘর ঝাড় দেয়া বন্ধ করে বাইরে গেল বেশ ভারিক্কি চালে। তার কথা শোনা গেল, সে বেশ মরুব্বির মতো কথা বলছে দু’জনের সঙ্গে।
কিছু পর সে ঘরে এসে এনায়েতুল্লাকে বলল, সালাম ভাই বরকত ভাইকে বকতাছে।
কেন, বকবে কেন? বকার কি হয়েছে? অবাক হয়ে তাকালেন এনায়েতুল্লা।
রাজ বলল, বরকতরে আপনে যে গরম কোট দিছিলেন হেইডা সে বিক্রি কইরা দিছে। তার লাইগা।
বিক্রি করে দিয়েছে? বলিস কি! খুব খারাপ কথা। তাকে বিক্রি করার জন্য দিইনি আমার কোট। পরার জন্য দিয়েছি। এত বড় সাহস হলো কি করে তার।
এই সময় দাউদ ফোনে কথা বলা শেষ করে ঘরে ঢুকল। তিনি তার দিকে তাকিয়ে বললেন, শুনেছ? রাজু বলছে বরকত নাকি আমার দেয়া গরম কোটটা
বিক্রি করে দিয়েছে। শুনে এসো তো ব্যাপারটা কি। সত্যি হলে ওকে জিজ্ঞাসা করতে হবে কেন এমন কান্ড করল সে।
দাউদ বাইরে গিয়ে বরকতের সঙ্গে কথা বলল। তার কথার স্বর ওঠা-নামার শব্দ পাওয়া গেল ভেতরের ঘর থেকে। একটু যেন উত্তেজিত হয়ে পড়েছে দাউদ, ভেতরে বসেই টের পেলেন এনায়েতুল্লা।
কান পেতে শোনার চেষ্টা করলেন কিন্তু কিছু বুঝতে পারলেন না। তবে দাউদ যে খুব করে বকুনি দিচ্ছে বরকতকে তা বোঝা গেল। বেশ রেগে গেছে সে,যার জন্য তোতলাচ্ছে মাঝে মাঝে। এটা তার মুদ্রা দোষ।
কিছু পর দাউদ বসার ঘরে এসে বলল, বরকতকে রাখা যাবে না। আজই বরখাস্ত করতে হবে।
কেন? কাপড়টা বিক্রি করার জন্য? কারণটা জানতে হবে না? তারপরই না বরখাস্তের কথা আসবে।
এনায়েতুল্লা তাকালেন ছেলের দিকে।
শুধু বিক্রির জন্য না। বরকত জুয়া খেলে। পাড়ার অন্য দারোয়ানদের সঙ্গে। রাতের বেলা জুয়ার আড্ডায় বসে। জুয়ায় হেরে গিয়ে আপনার দামি কোট বিক্রি করে দিয়েছে হারামজাদা।
শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান এনায়েতুল্লা। তার যেন বিশ্বাস হতে চায় না। দাউদের দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, জুয়া খেলে? আমাদের বরকত?বলিস কি?
সালাম তাই বলল। বরকতও জোর দিয়ে অস্বীকার করতে পারল না। শুধু বলল তিন পাত্তি না, কাচ্চু খেলে তারা। আমি বুঝতে পেরেছি আসলে সে তিন পাত্তিই খেলে।
তিন পাত্তি!
হ্যাঁ। মানে ফ্ল্যাশ। সেটাই আসল জুয়া। কাচ্চুও টাকা দিয়ে খেলা যায়, তবে সেখানে অল্প টাকার স্টেক থাকে। কাচ্চু খেলে হেরে গেলে বরকতকে আপনার দামি গরম কোট বিক্রি করতে হতো না। সে বড় ধরনের জুয়াই খেলে। সব দারোয়ান এসব করে। আরো খারাপ কাজও করে। আমি শুনেছি।সবাই জানে।
খারাপ কাজ? আর কি খারাপ কাজ করে তারা?
নেশা করে। মদ খায়, মাদক সেবা করে। আরো যা যা করে তা আপনাকে বলা যাবে না। দারোয়ানদের কান্ড কারখানা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। চারদিকে হাইরাইজ হওয়ায় ওদের সংখ্যা বেড়ে গেছে, সেই জন্য তারা বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বরকতকে রাখা যাবে না। একবার যখন খারাপ সংসর্গে পড়েছে সে আর ভালো হতে পারবে না।
এনায়েতুল্লা বললেন, এতদিনের পুরনো দারোয়ান,সে এমন হয়ে গেল? বিশ্বাস হতে চায় না।
দাউদ বলল, সঙ্গ দোষ। আগে ভালোই ছিল। এখন অন্যদের পাল্লায় পড়ে খারাপ হয়ে গেছে।
তাহলে কি করা যায়? বরকতকে বরখাস্ত করতে চাও? তিনি দাউদের দিকে তাকালেন।
দাউদ বলল, আরেকজন দারোয়ান পেলে ওকে বরখাস্ত করা হবে। এখন করলে বাড়ি পাহারা দেয়ার
কেউ থাকবে না।
তারপর সে রাগের সঙ্গে বলল,কত বড় সাহস!
এনায়েতুল্লা কিছুক্ষণ চিন্তা করেন। তারপর বললেন,ওকে একটা ওয়ার্নিং দিয়ে দাও। দেখো শুধরায় কিনা। বলবে আবার যদি শুনতে পাই যে সে জুয়া খেলছে তাহলে শুধু চাকরি যাবে না, তাকে পুলিশে দেয়া হবে।
রাজু উৎসাহে বলল, জ্বি। তারে পুলিশে দেন নানা। হে বড় খারাপ হইয়া গ্যাছে। কথায় কথায় মেজাজ দেখায়। হেই দিন আমারে একটা চড় মারছে।
এনায়েতুল্লা বললেন, চড় মেরেছে? কই, তুই তো বলিসনি আমাকে।
রাজু বলল, মামিরে কইছি। তিনি কইছেন আপনারে না জানাইতে। আপনি ধমকা-ধমকি করবেন।আপনার শরীর খারাপ হইয়া যাইব। আমি তাই আপনারে কই নাই। মামিই তারে বকা দিছে।
দাউদ বলল, ওয়ার্নিংয়ে কিছু হবে না। একবার যখন খারাপ হয়েছে সে আর ভালো হতে পারবে না। তাও আপনি যখন বলছেন ওকে একটা চান্স দেয়া যায়।
বলে সে বাইরে চলে গেল। কিছুপর শোনা গেল সে ধমকের স্বরে কথা বলছে বরকতের সঙ্গে। তাকে শাসাচ্ছে। ওয়ার্নিং দিচ্ছে। কান খাড়া করে শুনলেন এনায়েতুল্লা।
ফিরে এসে দাউদ তাকে বলল,আপনাকে কতবার বললাম এদের দামি কাপড়গুলো দেবেন না। দেখছেন এখন কি ফল হয়েছে?বাকিরাও বিক্রি করবে। অত দামি কাপড় ওরা পড়ে
না। আপনি শুনলেন না আমার কথা।
এনায়েতুল্লা চুপ করে থাকলেন। পড়ার ভঙ্গি করে খবরের কাগজে মুখ নামালেন, কিন্তু তিনি পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছেন না।
তুলি ঘরে এসে বলল,কি হয়েছে দাদু? আপনারা উত্তেজিত হয়ে কথা বলছেন। জোরে জোরে। আমি আমার ঘর থেকেও শুনতে পেলাম।
দাউদ বলল, কিছু না। দারোয়ানটা ঠিকমতো পাহারা দেয় না তাই একটু বকাঝকা করতে হলো।
তুলির হাতে কয়েকটা পেপারব্যাক। সে এনায়েতুল্লার হাতে বইগুলো দিয়ে বলল, এগুলো পড়তে পারো দাদু। বেশ সুখপাঠ্য, মন ভালো করে দেয়। পাওলো কোয়েলহোর লেখা। ব্রাজিলের
লেখক। বেশ মিস্টিকাল ভাব আছে তার লেখায়। বিশেষ করে ‘দি অ্যালকেমিস্ট’ বইটায়। পড়ে দেখ। এটা বেস্ট সেলার হয়েছিল। অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
এনায়েতুল্লা চটি বইটা হাতে নিলেন। প্রচ্ছদে লেখা : এ ফেবল অ্যাবাউট ফলোইং ইওর ড্রিম। পেছনের পৃষ্ঠায় লেখা : কয়েক দশক পর একটা বই ছাপা হয় যা পাঠকদের জীবন চিরদিনের জন্য পরিবর্তন করে দেয়।’ তারপর নিচে ছোট একটা পরিচিতি বইটি সম্বন্ধে : দি অ্যালকেমিস্ট, স্যান্টিয়াগো নামে আন্দালুসিয়ার এক মেষ পালকের অ্যাজিক-সদৃশ্য
জীবনের কাহিনী। সে পার্থিব সম্পদ আহরণের উদ্দেশে জন্মভূমি স্পেন ছেড়ে দেশ ভ্রমণে বার হয়। তানজিয়ার্সের বাজার থেকে ইজিপ্টের মরুভূমি পার হয়ে সে পৌঁছায় এক স্থানে যেখানে তার সঙ্গে দেখা হয় অ্যালকেমিস্টের। অ্যালকেমিস্ট তাকে ধন-রত্ন সম্বন্ধে যা বলে সেসব সে ভ্রমণপথেই দেখতে পেয়েছে। এই সব ধন-সম্পদের গল্প শুনে সে বুঝতে পারে যে নিজের অন্তরের ডাক শোনাই বিজ্ঞতার পরিচয়; যাত্রাপথে সে যেসব সঙ্কেত দেখেছে তার পাঠোদ্ধার করার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা আছে জানতে পারে।
এনায়েতুল্লা কোয়েল হোর নাম শুনেছেন। বেশ কয়েক বছর আগে টাইম অথবা নিউজউইকের পাতায় ছবিসহ তার ওপর একটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। মিশ্র মূল্যায়ন ছিল সেই লেখায়।
বোহেমিয়ান জীবনযাপন করেছেন বলে তাকে তুলনা করা হয়েছে বিট জেনারেশনের জ্যাক ক্যারুয়াকের সঙ্গে। প্রতিবেদনটি পড়ে তার মনে হয়েছিল কোয়েলহো প্রচলিত নিয়ম-কানুনের বাইরে
জীবনযাপনে এক ধরনের অতীন্দ্রীয় অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন যার নাম দেয়া যায় মিস্টিসিজম।
কোয়েলহো কি ‘অ্যালকেমিস্ট’ বইতে সেই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন? তিনি তুলির হাত থেকে বইটি নিয়ে বললেন, থ্যাঙ্ক ইউ। পড়ব। এর নাম শুনেছি। আগে পড়া হয়নি। অবশ্য পান্থপথ আর অন্যান্য রাস্তায় গাড়ি থামলেই দেখেছি হকাররা অন্য বইয়ের সঙ্গে এ লেখকের বইও বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। তিনি তাকে বলতে পারেন না যে একদিন
হকারের কাছ থেকে মার্কেজের আত্মজৈবনিক (?)‘মেমোয়ার্স অব মাই মেলানকলি হোরস্’ বইটিও পান্থপথ থেকে কিনেছিলেন কৌতূহলী হয়ে।
তুলি বলল, এর আরো বই আছে আমার কাছে। দি পিলগ্রিমস। দা ভকিরিজ। দি ফিফথ মাউন্টেন। আরো।
তিনি অবাক হয়ে বললেন, এক লেখকের এতগুলো বই কিনেছিস! প্রবন্ধ লিখবি নাকি? গবেষণার কাজে লাগবে?
তুলি বলল, না। কোয়েলহো এখন কাল্ট ফিগার হয়ে গেছেন। সব বয়সের পাঠক আছে তার। তবে আমার বয়সের ছেলেমেয়েদের কাছেই তিনি বেশি জনপ্রিয়।
এনায়েতুল্লা বললেন, হ্যারি পটারের চেয়েও? পে আর রাউলিংয়ের?
তুলি বলল, হ্যারি পটারের অন্য আকর্ষণ। অ্যাজিক।অ্যাজিক কে না ভালোবাসে। কোয়েলহো রাউলিংসের চেয়ে সিরিয়াস বই লেখেন।
শুনে এনায়েতুল্লা খুশি হলেন। এখনকার প্রজন্ম যে সিরিয়াস ফিকশন পড়ে এটা আনন্দের কথা।আজকাল তো ফ্যান্টাসি আর অ্যাকশনধর্মী লেখার যুগ। সিনেমাতেও তাই।
মুখে বললেন বটে যে পড়বেন কিন্তু তিনি সঙ্গে সঙ্গেই দি অ্যালকেমিস্ট পড়তে শুরু করলেন না । তিনি এখন গোপনে পড়ছেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লেখা ‘মেমোরিজ অফ মাই মেলানকলি হোরস্’। আত্মজৈবনিক, না বললেও বেশ বোঝা যায়। বইয়ের বিষয় রগরগে, সেনসুয়াল, একটু বেশি খোলামেলা। নায়কের বয়সের তুলনায় বেশ বেমানান। নব্বই বছরে পদার্পণের আগে নায়ক তার জন্মদিন পালনের জন্য এক কুমারী মেয়েকে উপভোগ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেই অভিলাস প্রকাশ করে নিষিদ্ধ পল্লীতে তার পরিচিত এক অ্যাডামের কাছে। পরিচিত সেই অ্যাডাম তার জন্য এক কুমারী কিশোরী মেয়েকে নিয়ে আসে কিন্তু বিছানায় শুয়েই সে সারাদিনের কায়িক পরিশ্রমের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে। এরপর যতবারই মেয়েটির সঙ্গে
নায়ক মিলিত হয় সে বিছানায় গিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে।বইটি অর্ধেক পড়েছেন তিনি, তার মধ্যেই জাপানি লেখক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার লেখা ‘হাউজ অফ স্লিপিং বিউটিজ’ বইটির কথা তার মনে পড়ে গেছে।
অনেক মিল রয়েছে দুটি বইয়ের কাহিনীর মধ্যে। মার্কেজ কি জেনেশুনেই কাওয়াবাতার অনুকরণ বা অনুসরণ করেছেন? তাই মনে হয়, কেননা বইটির প্রথমেই ‘হাউস অফ স্লিপিং বিউটিজ’ বই থেকে একটা অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করা হয়েছে। মার্কেজ প্রথমেই জানিয়ে দিচ্ছেন যে তার বইটির বিষয়বস্তু কাওয়াবাতার কাছ থেকে ধার করা যার অর্থ হবে এই যে কাওয়াবাতা বার্ধক্যে যৌনতার যে প্রয়োজন বা ভূমিকার কথা ভেবেছেন তিনিও তার সমর্থন করেন। কেবল প্যারোডির জন্য মার্কেজ এ বই লেখেননি, এর মাধ্যমে তিনি জৈবিক একটি
বাস্তবতার প্রতি আলোকপাত করতে চেয়েছেন।
এনায়েতুল্লা সাহিত্য সমালোচক নন, একজন পাঠক। বোদ্ধা পাঠকই তাকে বলা যায়। তিনি তুলনা করতে পারেন দুটি বইয়ের বিষয় ও লেখার মধ্যে, কিন্তু করছেন না। যে বিষয় তার কাছে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে তা হলো পুরুষের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে যৌনানুভূতির পরিণতি। কাওয়াবাতা আর মার্কেজের বই পড়লে মনে হবে পুরুষের যৌন সম্ভোগের কোনো বয়স নেই, বার্ধক্য সেখানে কোনো অন্তরায় না। কিন্তু নিজের দিকে তাকিয়ে তিনি এর স্বপক্ষে সমর্থন পান না। তার কাছে মেয়েদের যৌন আবেদন কবেই শেষ হয়ে গেছে। এখন কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখলে তিনি তার সৌন্দর্যই উপভোগ করেন, কামনা-বাসনার অনুভূতি ছাড়াই। তার সেই উপভোগে ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি থাকে যেমন, দেখা, শোনা। কিন্তু তার মধ্যে স্পর্শ করার তাগিদ নেই, মিলিত হওয়ার তো নেই-ই। অথচ মার্কেজ এবং কাওয়াবাতার বইতে তাদের নায়ক চরিত্র আশি-নব্বই বছর অতিক্রম করলেও নিষিদ্ধ পল্লীতে যায় কুমারী কিশোরী মেয়েদের সন্ধানে। দু’জনেই ঈপ্সিত কিশোরীদের পেয়ে যায় আর দুজনেরই অভিজ্ঞতা হয় অভিন্ন :
কিশোরীরা ঘুমিয়ে পড়ে চোখের সামনে এবং ঘুমিয়েই থাকে। শুধু দেখে দেখেই তাদের কামনাবাসনার পরিতৃপ্তি ঘটে কিন্তু এর মধ্যে যা স্পষ্ট হয় তা হলো বার্ধক্যে এসেও নারীর নিবিড় সঙ্গ লাভের বাসনা এবং মিলিত হওয়ার কামনা। এ প্রবণতা তার কাছে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়, অন্তত নিজেকে দিয়ে বিচার করলে। তিনি ভাবেন আর ভাবতে গিয়ে বেশ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন; জৈবিক নিয়মই যদি হবে তাহলে এমন পার্থক্য থাকবে কেন পুরুষে পুরুষে? বিজ্ঞানীরা বলবেন এ প্রশ্নের উত্তর রয়েছে জেনেটিক কোডে। কেউ জেনেটিক্যালি ওভারসেক্সড, কেউ তেমন না। এটাই সহজ উত্তর।
ভাবতে ভাবতে অনেক আগে দেখা ‘ডন হুয়ান’সিনেমার কথা মনে পড়ল তার। নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছিল অ্যারল ফ্লিন। শেষ দৃশ্যে সে তার সঙ্গীকে বলেছিল, দেয়ার ইজ ডন হুয়ান ইন এভরি অ্যান। দেয়ার ইজ মোর অফ ইট ইন ডন হুয়ান। হ্যাঁ, এটাই উত্তর। কিন্তু এরপরও বিষয়টি নিয়ে তার চিন্তা শেষ হয় না। তিনি বিষয়টি নিয়ে ভাবেন।
জীবনে যৌনতার, যৌন সম্ভোগের ভূমিকা কি? শুধুই প্রজনন তা বলা যাবে না, কেননা সম্ভোগের সময় বা আগে কোনো পুরুষ সচেতন হয়ে সন্তান লাভের কথা ভাবে না; রিপু তাড়িত হয়েই সে মিলিত হয় সঙ্গিনীর সঙ্গে। কাম বোধের সঙ্গে শরীর আর মনের যে সম্পর্ক আছে তা জানার জন্য কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। কিন্তু একটা সময়ের পর কি সেই বোধ ফুরিয়ে যায়, বাহুল্য হয়ে পড়ে? যদি তাই হয় তাহলে যে পুরুষ নারী সম্ভোগহীন জীবনযাপন করে তার শরীর এবং মনের ওপর কি কোনো প্রভাব পড়ে? যদি পড়ে সেই প্রভাব কি ইতিবাচক না নেতিবাচক? মনে মনে প্রশড়বগুলো ঘোরে, কিন্তু উত্তর পান না। মার্কেসের চটি বইটা কয়েকবার পড়েন তিনি; সেখানে তার প্রশ্নের উত্তর নেই। বরং প্রশ্নটাকে উসকে দেয়।
টেবিলে কোয়েলহোর বইয়ের ওপরে মার্কেসের বই রাখা। মার্কেসের বইটা একবার পড়া হয়েছে, আবার পড়বেন ঠিক করেছেন। একজন নব্বই বছর অতিক্রান্ত বৃদ্ধের কাছে অর্থের বিনিময় শরীর বিক্রি করে যে কিশোরী তার প্রতি চরিত্রটির দীর্ঘস্থায়ী আকর্ষণ বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। তার মনে হয় এ শুধু স্বভাবজাত প্রবণতার বিকৃতি না, অতিরঞ্জনও।
কাওয়াবাতা এমন চরমভাবে আত্মসমর্পণ করাননি তার চরিত্রকে রিপুর কাছে, কামনার সামনে। সেখানে সংযম আছে, সৌন্দর্যানুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। বুড়ো হয়ে গেলেই যৌন বিষয়ে আগ্রহ
শেষ হয়ে যায় না, কিন্তু আগের তুলনায় তার অবদমনেই স্বাভাবিকতা থাকে। কেউ তেমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নিজে নিজেই, অনায়াসে, কেউ বাইরের চাপে, অনিচ্ছায়। তিনি স্বস্তিবোধ করেন এই ভেবে যে বার্ধক্যে পৌঁছে তাকে যৌন কাতরতায় ভুগতে হয়নি, হচ্ছে না। সেক্স নিয়ে কোনো ফ্যান্টাসি নেই তার। বায়োলজির ব্যাখ্যা ছাড়াও এর অন্য ব্যাখ্যার মধ্যে রয়েছে তার বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ এবং উৎসাহ : বই পড়া, গান শোনা,ট্রাভেলিং। এসব সূক্ষ্ম উপভোগ (ট্রাভেলিংয়ের অভিজ্ঞতাকেও তিনি এর মধ্যে ফেলেন) তাকে স্থূল উপভোগ থেকে দূরে রেখেছে, বলা যায় মুক্তি দিয়েছে। এ উপসংহারে এসে তিনি বেশ সন্তুষ্ট হন,স্বস্তি লাভ করেন। তিনি কারো ব্যবহারের প্রতি জাজমেন্টাল হচ্ছেন না, কেবল বিষয়টা তলিয়ে বিচার করতে চেয়েছেন যতটা নির্মোহভাবে সম্ভব তেমন করে।
বিকেলে সবাই একসঙ্গে চা-নাস্তা খাচ্ছে। তুলি কোকের গ্লাস হাতে নিয়ে বলল, দাদু কোয়েলহোর বইটা পড়া শুরু করেছ? যে বইটা তোমাকে দিলাম।
এনায়েতুল্লা একটু চমকে উঠলেন শুনে, যেন ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অপ্রস্তুত। চায়ের কাপ নামিয়ে সামলে নিয়ে বললেন, না। এখনো শুরু করিনি। আগে যে বইটা পড়ছিলাম সেটা শেষ করার পর ধরব।
তুলি বলল, তোমার প্রিয় স্টিফেন কিং কিংবা টম ক্ল্যান্সির বই না তো? খুব উত্তেজনাকর আর হরর ফিল্ড সেই সব বই।
এনায়েতুল্লা বললেন, টম ক্ল্যান্সির বইতে হরর নেই। অ্যাডভেঞ্চার, অ্যাকশন থ্রিলার বলতে পারিস। স্টিফেন কিংয়ের বইতে হরর আছে ঠিকই।
তুলি বলে, তুমি তো আবার রবার্ট লুডলামের বইও পড়। বোর্ন আইডেন্টিটি! আগে তোমার পড়ার রুচি এত খারাপ ছিল না।
এনায়েতুল্লা হেসে বললেন, সব ধরনের বই-ই পড়ে দেখতে হয়। আমি তো কোনো পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি না।
জয়নাব অবাক হয়ে তুলির দিকে তাকিয়ে বলল, তুই এতসব নাম জানিস কি করে? পড়িস নাকি ওইসব বই? তারপর বলে, ক্লাসের বই ফেলে বড়দের বই নিয়ে সময় নষ্ট করলে হবে?
এনায়েতুল্লা হেসে বলেন, বই পড়ার অভ্যাসটা সে মনে হয় দাদুর কাছ থেকে পেয়েছে। তোমরা দুজনের কাউকে বই পড়তে দেখি না, খবরের কাগজেও শুধু চোখ বোলাও।
তারপর বলেন, আমার আর তুলির পছন্দ আর অপছন্দ এক না। আজ ওআমাকে একটা বেস্ট সেলার বই পড়তে দিল। মনে হচ্ছে খুব ভালো বই। তুলি জানে কোনটা ভালো,কোনটা না। তিনি তুলির দিকে তাকিয়ে বললেন,তোমার মা যা বলল তাও ঠিক। ক্লাসের পড়াশোনা রেখে বাইরের বই বেশি পড় না।
জয়নাব বলল, শুধু কি বাইরের বই? যতক্ষণ জেগে আছে গান শুনছে। কখনো খোলা কানে, কখনো কানে প্লাগ লাগিয়ে। এত গান শুনলে পড়ায় মনোযোগ দেয় কেমন করে তা বুঝি না।
তুলি ঠোঁট ফুলিয়ে বলে, খুব মনোযোগ দেয়া যায়। সবাই এমন করে। গান শুনতে শুনতেই অ্যাথ করে। ইংরেজি পড়ে।
জয়নাব বলল, যা সব লাউড গান শোনো, পড়ায় মন দেয়া যায়? বিশ্বাস হতে চায় না।
তুলি কিছু না বলে মায়ের দিকে ঠোঁট বাঁকা করে তাকাল, এ মুহূর্তে মাকে তার পছন্দ হচ্ছে না।
এনায়েতুল্লাহ বললেন, আজকাল কার গান শুনছিস তুলি? এখনো অ্যাডোনা, মাইকেল জ্যাকসন, এলটন জন, ইউ-২ এদের?
তুলি বলল, তারা পুরনো হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে শুনি। আমার এখনকার ফেভারিট বেয়ন্সে নোলেজ,টেইলার সুইফট, লেডি গাগা, অ্যামি ওয়াইনহাউস।
এনায়েতুল্লাহ হেসে বললেন, দারুণ নাম দেখি সব। লেডি গাগা? সে কোনো লর্ডের বউ? আর ওয়াইনহাউস, কেমন যেন ওয়াইনমেকার ওয়াইনমেকার মনে হয়।
তুলি বলল, লেডি গাগা কোনো লর্ডের বউ না। ওটা তার নিজের দেয়া নাম, পাবলিসিটির জন্য ব্যবহার করে। তার নামের মতো সে বিচিত্র পোশাক পড়েও চমকে দেয়। তবে আমার ফেভরিট হলো অ্যামি।অ্যামি ওয়াইনহাউস। সি ইজ ফ্যান্টাস্টিক। তার একটাই সমস্যা।
বলে সে একটু থামে। তারপর বলে, সি কান্ট স্টপ ড্রিঙ্কিং ।
ড্রিঙ্কিং মানে খুব পানি খায়? এটা সমস্যা হবে কেন?
এনায়েতুল্লা প্রশ্ন করেন।
ডোন্ট বি নাইভ দাদু। ড্রিঙ্কিং মানে হার্ড ড্রিঙ্কস্। অ্যালকোহল। সি ইজ যাকে বলে অ্যালকোহলিক।
জয়নাব তার দিকে অসন্তুষ্ট চোখে তাকিয়ে বলে,এমন একজনের গান শোনো কেন? সে তোমার প্রিয় হয় কি করে?
কেন হবে না? তার গানের সঙ্গে ড্রিঙ্কিং হ্যাবিটের কোনো সম্পর্ক নেই। সি ইজ পিওর অ্যাজ এ সিংগার। আই মিন হার ভয়েস। তার ‘ব্যাক টু ব্ল্যাক’ অ্যালবামের গানগুলো শুনলে বুঝবে।‘রিহ্যাব’ গানটা তো ফ্যাবুলাস। স্যাডনেসের চমৎকার ইন্টারপ্রিটেশন। পিওর ইমোশন বলতে যা বোঝায়।
জয়নাব বলল, এমন একজন গায়িকা তোমার রোল মডেল হয়ে গেল এটা দুশ্চিন্তার বিষয়।
তুলি ধৈর্য হারিয়ে বলল, ওহ মাদার। স্টপ ইট। সি ইজ নট মাই রোল মডেল। সি ইজ জাস্ট মাই ফেভরিট সিঙ্গার। দ্যাটস অল।
এনায়েতুল্লা বললেন, তুলি তুমি বাংলা গান শোনো না? রবীন্দ্র-নজরুল সঙ্গীত? অন্য গায়ক-গায়িকাদের গান।
তুলি ঠোঁট উল্টে বলে, রবীন্দ্রসঙ্গীত ইজ টু স্লো। রিদম নেই। বিট নেই। ভেরি স্লো।
এনায়েতুল্লা বলেন, কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত বেশ দ্রুত লয়ের। নজরুল সঙ্গীতও তাই। হেমন্ত কুমার, সলিল চৌধুরীর গানও দ্রুত লয়ের। অবশ্য তারা পুরনো হয়ে গেছেন।
তুলি বলল, আমি বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক শুনি মাঝে মাঝে। নট ব্যাড। চমৎকার ফিউশন করে তারা। ব্যান্ড মিউজিক দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি অ্যালবাম হয়েছে, নাম ‘শিরোনামহীন’। শুনেছ?
এনায়েতুল্লা বললেন, না। শুনিনি।
তুলি বলল, ইট ইজ ওকে। ব্যান্ড মিউজিকের সঙ্গে মোটামুটি ভালোভাবেই মিলিয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীত।দেব তোমাকে। রশিদ খান বলে একজন ক্ল্যাসিকাল গায়ক, তার সঙ্গে নচিকেতা ঘোষ নামে এক রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক যুগলবন্দি গেয়েছেন। মন্দ না। শুনেছ সেটা?
এনায়েতুল্লা কিছুটা বিব্রত হয়ে বললেন, না শুনিনি। তারপর অবাক হয়ে বললেন, তুই দেখি গানের অনেক কিছু জানিস।
তুলি বলল, তুমি শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত আর নজরুল সঙ্গীতই শোনো। দেশি-বিদেশি আধুনিক গানও শোনা উচিত।
এনায়েতুল্লা বলেন, শুনি তো। মোজার্ট, বিটোফেন। এদের ক্ল্যাসিকাল। জাজ সঙ্গীত তাও শুনি।
তুলি বলল, ওসব তো ক্লাসিক্যাল। জাজও পুরনো। রক, পপ, হিপহপ, রেগে এসব নতুন ধারার গান শুনতে হবে। না শুনলে বুঝবে না মিউজিকে কত পরিবর্তন এসেছে। এখন অবশ্য রক, পপ সব মিশে যাচ্ছে। আর অ্যান্ড বির সঙ্গে সোলের তফাৎ খুঁজে পাওয়া যায় না।
এনায়েতুল্লা হেসে বললেন, দিস ওইসব গান। শুনব। নতুন অভিজ্ঞতা হবে।
পাশে বসে জয়নাব দুজনের কথা শুনছিল। সে মাথা নেড়ে বলল, বাবা আপনি ওইসব রাবিশ শুনবেন না। কানে তালা লেগে যাবে। বুক ধড়ফড় করবে। আপনার হার্ট উইক। ডাক্তার বলেছে সাবধানে থাকতে।
শুনি তিনি জোর গলায় বললেন, আমার হার্ট মোটেও উইক না। ডাক্তাররা মিছেই বলে। বিশ্বাস করি না আমি। তোমরাও করো না। তারপর তুলির দিকে তাকিয়ে বলেন, হ্যাঁ দিস তোর কালেকশনের সিডিগুলো। শুনব একটা একটা করে। নতুন অভিজ্ঞতা সব সময় আনন্দের। হয়তো সব গানই পছন্দ হবে না। কিন্তু একবার হলেও শুনতে ক্ষতি কি?
তুলি খুশি হয়ে বলে, দাদু ইউ আর গ্রেট। গান শুনে যে উত্তেজিত হতে হয় না, এটা বুঝতে পারো। মা পারে না। সি হেটস মিউজিক। হোয়াট এ পিটি।
তারপর সে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, চিন্তা করো না। দাদু অসুস্থ হয়ে পড়বে এমন কিছু করতে দেব না। তাকে সুস্থ রাখার জন্য তোমাদের চাইতে আমি কম কেয়ারফুল না। দাদু ইজ ইন সেফ হ্যান্ডস। তাই না? বলে সে এনায়েতুল্লার দিকে তাকিয়ে চোখ টেপে। এনায়েতুল্লা হাসেন।
জয়নাব ঠোঁট বাঁকা করে উঠে যায় টেবিল থেকে,বোঝা যায় সে দুজনের কথা পছন্দ করতে পারেনি।
রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে জয়নাব দাউদকে বলল,তুলি বাবাকে তার রক, পপ এসব গানের সিডি দিচ্ছে। ঠিক হচ্ছে? বাবাকে রিল্যাক্স করতে বলেছে ডাক্তার। ধূম-ধাড়াক্কা গান-টান শুনলে তা হবে?
দাউদ হেসে বলল, তুলি দিলে হবে কী? আব্বা সেসব গান শুনবেন বলে মনে হয় না। তুলিকে খুশি করার জন্যই বলেছেন। শোনার সময় তিনি তার পছন্দের গানই শুনবেন, এতদিন যা করে এসেছেন।
জয়নাব বলল, কিন্তু বাবা তুলির কথা শুনে আপত্তি করেননি। ইতস্ততও না। বরং খুশি হলেন মনে হলো। তুলিকে বললেন শুনবেন তার কালেকশনের গানগুলো।
দাউদ বলল, এটা এমন কিছু সিরিয়াস ব্যাপার না। এ নিয়ে তুমি মাথা ঘামিয়ো না। গান শুনে আর যাই হোক আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়বেন না। কেউ কখনো হয়নি।
জয়নাব অসন্তুষ্ট হয়ে পাশ ফিরে শুয়ে বলল, মেয়েটা বখে যাচ্ছে। স্পয়েল্ট হচ্ছে। তুমি তাকে কিছুই বলছ না।
দাউদ বলল, ওরা এ প্রজন্মের ছেলেমেয়ে। তাদের জোর করে কিছু বলা যাবে না। জোর করার অন্য বিষয় আছে, গান শোনা তার মধ্যে পড়ে না। তুমি একটু বাড়াবাড়ি কর।
শুনে জয়নাব দাউদের কাছ থেকে আরো একটু সরে গেল, বালিশটা শব্দ করে রাখল মাথার নিচে।
গভীর রাতে এনায়েতুল্লার ঘুম ভাঙল। তিনি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে উঠলেন। স্যান্ডেল জোড়া পায়ে গলিয়ে ঘরের দরজা খুলে বের হলেন। খুব আস্তে আস্তে হেঁটে গেলেন বসবার ঘরে, আধো আলো-অন্ধকারে সবকিছু দেখে। ঘরের মাঝখানে গিয়ে একটু দাঁড়ালেন, কিছু শোনার চেষ্টা করলেন। কোনো শব্দ শুনতে পেলেন না। নিশ্চিন্ত হয়ে তিনি আবার ধীর পায়ে হেঁটে বসবার ঘরের দরজা খুলে বাইরে যাওয়ার প্যাসেজে এলেন। সামনে বাইরে যাওয়ার দরজা, বন্ধ। এটা খুললেই গাড়ি বারান্দায় যাওয়া যাবে। তিনি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর
ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সাবধানে দরজাটা খুললেন। গাড়ি বারান্দার ওপরে বাল্ব জ্বলছে, নিচে অনেকটা জায়গা দেখা যাচ্ছে। তিনি হেঁটে সিঁড়ির কাছে গেলেন। তারপর বাঁ দিকে গার্ডরুমের দিকে তাকালেন। দেখলেন কে যেন টুলে বসে ঢুলছে।
তিনি সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গার্ডরুমের কাছে গিয়ে লোকটার সামনে দাঁড়ালেন, মাথা নিচু করে ঢুলতে থাকা লোকটা টের পেল না। সে তখনো মাথা ঢুলিয়ে ঘুমোচ্ছে, মাথাটা বুকের কাছে এসে পড়েছে তার। তিনি লোকটার কাঁধে ধাক্কা দিতেই সে ধড়মড়িয়ে উঠে চিৎকার করতে গেল। তিনি ধমক দিয়ে বললেন, বরকত চুপ। শব্দ করো না। চিৎকার
করার দরকার নেই।
তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার পাহারা দেয়ার কথা। এই সময় ঘুমাচ্ছ কেন?
বরকত চোখ কচলে নিয়ে বলল, ভুল হইয়া গ্যাছে। মাফ কইরা দেন। আর করব না।
তিনি হেসে বললেন, এভাবে পাহারা দিলে চোর এসে ভেতরে ঢুকলেও টের পাবে না। তোমার এখানে থেকে তাহলে লাভ? দিনের বেলা কী কর? তখন ঘুমোবে। তোমাকে আর একটা ওয়ার্নিং দেয়া হলো। আর যেন এমন না হয়।
কথা শেষ করে তিনি আগের মতো পা টিপে টিপে ভেতরের ঘরে ঢুকলেন। দরজাগুলো বন্ধ করলেন একটার পর একটা। তার মন বেশ প্রসন্ন। বরকত জুয়া খেলছে না, সতর্ক করে দেয়ায় কাজ হয়েছে।জেগে পাহারা দিচ্ছে না বটে কিন্তু অসৎ সংসর্গেও নেই। এটা একটা ইমপ্রুভমেন্ট। ব্যাটাকে বরখাস্ত করার দরকার হবে না বলে মনে হচ্ছে। বেশ সন্তুষ্টচিত্তে তিনি শোবার ঘরে ঢুকলেন। দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন, ভেতরে সবকিছু দেখে দিক ঠিক করে নিলেন। এখনো তাকে এভাবে চলাফেরা করতে হচ্ছে নিজের ঘরে।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  বিকেলের বেহাগ

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

হাসনাত আবদুল হাই- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...