অন্যান্য

তাঁর দরকার ‘লিভ টুগেদার’!

রংপুর জিলা স্কুলের মাঠে দুটো বটগাছ ছিল। আমরা সেই বটগাছের নিচে অনুষ্ঠান করতাম, অ্যাসেমব্লি করতাম, খেলতাম ও আড্ডা দিতাম। মাথার ওপরে ছিল পাখিদের অভয়নগর। তারা লাল লাল ফল খেত আর সেসবই একটু পরে বের করে দিত শরীর থেকে। আমরা মাথায় হাত বুলাতাম, গুঁড়ো গুঁড়ো বটের লাল ফল মাথা থেকে ঝরে পড়ত।
এমনি একদিন খেলার শেষে মাঠে বটগাছের নিচে বসে আড্ডা দিচ্ছি। আমাদের বন্ধু তাহের আলী বলল, ‘সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি রে, কখন কী ভুল হয়া যায়।’
‘কী ভুল করেছ তুমি, তাহের আলী?’
তাহের আলী বলল, ‘শোনো, ঢাকা গেছি। বড়লোক আত্মীয়র বাড়ি উঠেছি। বাথরুমে গেছি। বালতির অর্ধেকটা ভরা। বালতির পানি ঢেলে দিলাম কমোডে। তখন দেখি, বালতির পানিতে লুঙ্গি ভেজানো ছিল। সেই লুঙ্গির অর্ধেকটা চলে গেছে পাইপের ভেতর। অর্ধেকটা বাইরে। এখন না পারি ঢোকাতে, না পারি বের করতে।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল তাহের আলী—‘সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি রে, কখন কী ভুল হয়া যায়!’
তারপর রংপুর থেকে আমিও এলাম ঢাকায়।
ভোরের কাগজ-এ চাকরি করতে গিয়ে একজন সহকর্মী পেলাম। তাঁর নাম শাহানা হুদা রঞ্জনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে পাস করেছেন। দারুণ রসিক। কথায় কথায় জানতে পারলাম, রঞ্জনার বাড়িও রংপুর। এবং তাঁর একজন কাজিন আছে, নাম তাহের আলী। শুনে আমি হাসতে হাসতে বাঁচি না। সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি রে, কখন কী ভুল হয়া যায়।
‘আপনিই সেই বড়লোক আত্মীয়, রঞ্জনা!’
রঞ্জনা আর সুমনা শারমীন ছোটবেলার বন্ধু। তাঁরা তখন গল্প করতে শুরু করেন। শোনেন, ‘আমরা কী রকম বড়লোক ছিলাম।’
রঞ্জনার বাবা তখন ঢাকায় একটা ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক।
রঞ্জনা আর সুমনা থাকেন আসাদ গেট কলোনিতে, পড়তে যান ধানমন্ডি ও আজিমপুরের দুটো স্কুলে। তাঁরা যান বাসে চড়ে।
তখন একজন আরেকজনকে বলছেন, ‘দোয়া কর, যেন এত বড়লোক হতে পারি, যেন প্রতিদিন রিকশায় চড়ে চলাচল করতে পারি।’
শুনে দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক রঞ্জনার বাবা বলেছিলেন, ‘কোনো কিছু আশা করলে বড় আশা করো। দোয়া করো, যেন তোমরা প্রতিদিন মোটরসাইকেলে চড়তে পার।’
রঞ্জনা হাসেন। ‘বোঝেন, আমরা কী রকম বড়লোক ছিলাম।’
এখন তাহলে আমার আর তাহের আলীর কথা ভাবুন। আমাদের কাছে তো রঞ্জনারাই বড়লোক।
রঞ্জনার গল্প কেন মনে এল? সম্প্রতি আমাদের আরেক কবিবন্ধু জুয়েল মাজহার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন:
“বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকার ইংরেজি মান!!!
এটা একটি নামীদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার ১৮ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে দেওয়া স্ট্যাটাস:
‘Every year I am forgeted my birthday but my son, he is not forgeted. 19 October he give me. Birthday gift. Jear. Melaire brand watch. Feeling happiness.’
আমাদের মেধাবী বাচ্চাদের তাহলে কেন দোষ দিই? ওদের যা পড়ানো হবে তা-ই তো ওরা শিখবে। তাহলে আমাদের শিশুরা কিছু না পারলে তার দায়টা তো আমাদের বড়দেরই নাকি? ফুটনোট: তিনি ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষিকা নন।”
এই স্ট্যাটাস পড়ে আমি একটা মন্তব্য লিখেছিলাম— অনেকটা আঁতেল মার্কা মন্তব্য:
‘আমাদের ইংরেজির অবস্থা খারাপ। তার মানে এই না যে আমাদের বাংলার অবস্থা ভালো। বাংলায় একটা নির্ভুল চিঠি লেখার ক্ষমতা আমাদের বেশির ভাগেরই নেই। কেউ ভুল বাংলা লিখলে আমরা সেটা নিয়ে লজ্জা পাই না। কিন্তু ইংরেজি ভুল করলে আমরা খুব লজ্জা পাই। এটার কারণ কি ঔপনিবেশিক মানস? আসলে কেউ কেউ থাকেন, বানান-প্রতিবন্ধী। ভাষা-প্রতিবন্ধী। তিনি হয়তো তাঁর বিষয়ে খুব ভালো। খুব বড় বিজ্ঞানী বা চিকিৎসক বা খেলোয়াড়। কিন্তু বাংলা বা ইংরেজি লিখতে পারেন না। এটা নিয়ে হাসাহাসি করা উচিত নয়।’
কথাটা বললাম বটে, কিন্তু আমাদের শিক্ষার দৈন্য নিয়ে দুর্ভাবনা তাতে কমে না। যিনি ভাষা-প্রতিবন্ধী, তিনি কেন শিক্ষকতা করবেন?
রঞ্জনা আমাদের একটা গল্প শুনিয়েছেন। আমি বিশদ বর্ণনা দেব না। আমি গল্পের চরিত্রের পরিচয় গোপন রাখতে চাই।
তাঁদের একজন সাবেক সহকর্মী বলছেন, ‘খুলনার সার্কিট হাউসের ডিপোজিটেই আমাদের বাড়ি।’
‘ডিপোজিটে মানে?’
‘ডিপোজিটে মানে ডিপোজিটে। ঠিক ডিপোজিটেই আমাদের বাড়ি। সার্কিট হাউসের বারান্দা থেকেই দেখা যায়।’
একই ভদ্রলোক নাকি একবার আড্ডায় বলেছিলেন, ‘বহুদিন খাওয়াদাওয়া হয় না। হইচই হয় না। রঞ্জনা, আপনার বাড়িতে সবাইকে দাওয়াত দেন। এবার ‘লিভ টুগেদার’ করা দরকার।’
বলাবাহুল্য, ভদ্রলোক যথাক্রমে ‘অপজিট’ ও ‘গেট টুগেদার’ বলতে চেয়েছিলেন।
এই ভদ্রলোকই একবার তাঁদের অফিসের সবচেয়ে বড় কর্তার স্তুতি করছিলেন। বড় স্যার একটা ভালো কাজ করছেন। সবাই তাঁকে শ্রেণিমতো সাধ্যমতো ‘তেল’ দিচ্ছেন। ‘স্যার, আপনি যা করেছেন, এই রকম আর কেউ করেনি।’ ‘স্যার, আপনি একটা ভাবতে পারলেন, ভাবতে পারলেন আবার করতে পারলেন’… ‘আপনি স্যার সত্যিই মহান।’ এর মধ্যে আমাদের ডিপোজিট সাহেব বলে বসলেন, ‘স্যার, আপনি এত ভালো কাজ করেছেন, মনে হচ্ছে আপনাকে মমি করে রেখে দিই…’
এই গল্প শুনে আমরা হাসতে হাসতে বাঁচি না।
আমাদের কিন্তু একটা অবক্ষয় চলছে। শিল্প-সাহিত্য-শিক্ষা-চলচ্চিত্র ইত্যাদির ক্ষেত্রে আমরা বেশ একটা অবক্ষয়ের কাল পার করছি। আমাদের শ্রেষ্ঠ মানুষগুলো একে একে চলে যাচ্ছেন। তাঁদের বিকল্প দেখছি না।
এই যে একটা শূন্যতা, তার পেছনে একটা কারণ কিন্তু ১৯৭১ সালে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা। তালিকা প্রস্তুত করে বাড়ি থেকে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হলো আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। সবচেয়ে মেধাবী, সবচেয়ে সৃজনশীল মানুষগুলোকে। মুনীর চৌধুরীর মতো নাট্যকার শিক্ষক আমরা আর পাব কই? শহীদুল্লা কায়সারের মতো লেখক আর সাংবাদিক? জহির রায়হানের মতো চলচ্চিত্রকার?
সেই যে শূন্যতা, সেই ক্ষতি, তার ধকল আজও আমাদের দিতে হচ্ছে।

আনিসুল হক
আনিসুল হক
আনিসুল হক (জন্ম: মার্চ ৪, ১৯৬৫) একজন বাংলাদেশী লেখক, নাট্যকার ও সাংবাদিক। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক পদে কর্মরত আছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সত্য ঘটনা নিয়ে তাঁর লেখা মা বইটি বেশ জনপ্রিয়। [বাংলা ভাষার পাশাপাশি বইটি দিল্লী থেকে ইংরেজি ভাষায় এবং ভুবনেশ্বর থেকে উড়ে ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে । জন্ম[: আনিসুল হকের জন্ম রংপুর বিভাগের নীলফামারীতে। তাঁর পিতার নাম মো. মোফাজ্জল হক এবং মায়ের নাম মোসাম্মৎ আনোয়ারা বেগম। তাঁর স্ত্রীর নাম মেরিনা ইয়াসমিন। শিক্ষাজীবনঃ তিনি রংপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯৮১ সালে এস.এস.সি. এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে এইচ.এস.সি. পাস করেন। উভয় পরীক্ষাতেই সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান পান। এসএস সি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় তিনি ৩য় এবং এইচএসসিতে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৮ম স্থান লাভ করেন। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের(বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করেন। কর্মজীবনঃ আনিসুল হক বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকারের রেলওয়ে বিভাগে যোগদান করেন। অল্প কিছুদিন চাকরির পরই তা ছেড়ে দিয়ে সাংবাদিকতায় চলে আসেন। তিনি ১৯৮৭ সালে সাপ্তাহিক দেশবন্ধু পত্রিকার সহসম্পাদক, ১৯৮৯ সালে সাপ্তাহিক পূর্বাভাস পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, ১৯৯১ সালে সাপ্তাহিক খবরের কাগজের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত দৈনিক ভোরের কাগজের সহকারী সম্পাদক দায়িত্ব পালন করেন। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত দৈনিক প্রথম আলোর সাথে যুক্ত আছেন। তাঁর মূল ঝোঁক লেখালেখিতে। পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম লেখেন। বুয়েটে পড়ার সময় কবিতার দিকে বেশি ঝোঁক ছিল। পরবর্তীতে এর পাশাপাশি কথাসাহিত্যেও মনোযোগী হন। উপন্যাস, বিদ্রুপ রচনা, নাটক রচনায় প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। ২০১০ সালে তিনি আমেরিকার ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম (আইডব্লিউপি)কর্মশালায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখকদের সাথে যোগ দেন।।তিনি ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৭ জন লেখক আইডব্লিউপির কর্মশালায় যোগ দেন।১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এ আয়োজনে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১৩০টি দেশের এক হাজার ২০০ লেখক অংশ নেন। গল্পঃ যে স্বপ্ন দেখতে জানতো, আজকালকার ভালোবাসার গল্প, অসমাপ্ত চুম্বনের ১২ বছর পর। [৬] কবিতাঃ খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে (১৯৮৯), আমি আছি আমার অনলে (১৯৯১), আসলে আয়ুর চেয়ে বড় সাধ তার আকাশ দেখার (১৯৯৫), জলরংপদ্য (২০০২), তোমাকে ভাবনা করি। উপন্যাসঃ তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস মা (২০০৩ সালে প্রকাশিত)। এছাড়া বীর প্রতীকের খোঁজে, নিধুয়া পাথার, আয়েশামঙ্গল, খেয়া, ফাঁদ, বেকারত্বের দিনগুলিতে প্রেম, ভালোবাসা আমি তোমার জন্য কাঁদছি, ফাল্গুন রাতের আঁধারে, আমার একটা দুঃখ আছে, ক্ষুধা এবং ভালোবাসার গল্প, হৃদিতা, সেঁজুতি, তোমার জন্য, ৫১ বর্তী, আবার তোরা কিপ্টা হ,আলো-অন্ধকারে যাই,আমার একটা দু:খ আছে, আয়েশামঙ্গল, বারোটা বাজার আগে প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ব্যঙ্গাত্মক রচনাঃ পত্রিকায় ‘গদ্যকার্টুন’ নামে নিয়মিত ব্যঙ্গাত্মক রচনা লেখেন। এসব লেখা নিয়ে প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে কথাকার্টুন, গণতান্ত্রিক ফ্যান্টাসি‌‌, রাজা যায় রানি আসে, ছাগলতন্ত্র, অশ্বডিম্ব, সেই গাধা সেই পানি উল্লেখযোগ্য। নাটকঃ নাট্যকার হিসেবে তিনি ভিন্ন ধাঁচের নাটক উপহার দিয়েছেন। তাঁর রচিত দর্শকনন্দিত টেলিভিশন কাহিনীচিত্রের মাঝে রয়েছে নাল পিরান, করিমন বেওয়া, প্রত্যাবর্তন, সাঁকো, প্রতি চুনিয়া, চড়ুইভাতি, মেগা সিরিয়াল ৫১বর্তী প্রভৃতি। সিনেমার স্ক্রিপ্টঃ মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ব্যাচেলরএবং মেড ইন বাংলাদেশ সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন আনিসুল হক। এছাড়া তিনি থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, টেলিভিশন সিনেমারও স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। পুরস্কারঃ শ্রেষ্ঠ টিভি নাট্যকার হিসেবে পুরস্কার, টেনাশিনাস পদকসহ বেশ কয়েকটা পুরস্কার পেয়েছেন। সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন খুলনা রাইটার্স ক্লাব পদক, কবি মোজাম্মেল হক ফাউন্ডেশন পুরস্কার। ২০১২ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান।