বসন্ত আসবে বলে

বাংলাদেশে দু-একটি মাস ছাড়া ঋতুবৈচিত্র্য তেমনভাবে ধরা পড়ে না। এর মধ্যে ফাল্গুন-চৈত্র মাসের ঈষৎ শীতমিশ্রিত বসন্তকাল ঋতুরাজ হিসেবে আমাদের শরীরে অনুভূত হয়। বসন্ত কিছু দিন এ দেশের প্রাণকে মাতিয়ে দিয়ে যায়। এটা ঠিক, শীতকালও নয় এবং খরতাপের গ্রীষ্মও নয়। সাধারণত এই মাসে শিল্পী, সাহিত্যিক, কবিরা নিজেকে উন্মোচন করেন। কবিতা-গানে দিগন্তে প্রাণের কলেবর এবং একই সঙ্গে না পাওয়ার বেদনা মর্মরিত হয় যেন। ফাল্গুন এলে কৈশোরেই আমাদের মনে আনন্দের গুঞ্জরণ শুরু হতো। আমরা বসন্তকালকে ঋতুরাজ এমনি এমনি তো বলি না। বসন্ত এলে আমরা বলি, আমাদের কবিরা বলেন, ‘ফুল ফুটক না ফুটুক আজ বসন্ত।’ এই বসন্তের মধ্যেই কবি আনন্দ-উচ্ছ্বাসে আপল্গুত হন। বসন্ত আমাদের মধ্যে এলেও এ ঋতুরাজের বয়স খুবই অল্প, ক্ষণস্থায়ী, এসেই মিলিয়ে যায়। অনুভূত হয় গ্রীষ্মের খরতাপ আর বর্ষার ঝরঝরানি, আমাদের ঋতু চর্চা অতিশয় স্বল্পস্থায়ী, তবুও আমরা বসন্তের জয়গান গাই। কোকিল কোথায় ডাকল তা খুঁজে বেড়াই। এর কারণ হলো আমাদের মধ্যে তথাকথিত কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি। আমি কবি হিসেবে কৈশোরকাল থেকেই ফাল্গুন অর্থাৎ বসন্তের মাসগুলোতে অনেকটা দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়াতাম। ভাবতাম চারদিকে এমন সুন্দর আবহাওয়া মানুষ উল্লাস করছে না কেন? অবশ্য আমারও কবিতা ছাড়া আনন্দ প্রকাশের কোনো উপায় ছিল না। আমি নিজের স্বরে ফাল্গুনের গুণগান গাইতাম। এই মাস ক’টি যেন আমার জীবনে নেশা ধরিয়ে দিত, আমাদের জাতীয় জীবনেও এই পত্র-পল্লব শোভিত ফাল্গুন-চৈত্র নেশা ধরিয়ে দেয়। আমাদের জাতীয় জীবনে নেশা ধরিয়ে দিত। চলার আনন্দ, বলার আনন্দ, খাদ্যদ্রব্য সুস্বাদু, মাছ-মাংস, শাক ইত্যাদি খাদ্যের অঙ্গে স্বাদের ঘনঘটা। কোনো কিছুই অখাদ্য মনে হতো না, এমনকি প্রেমকেও মনে হতো খাদ্য। কেউ কেউ মুখ ফুটে এ কথা বলত, কেউ বলত না। তবে সবার কলমই এই সময়ে নরম হয়ে থাকত। বাতাস সুরভিত গাছপালা যেন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চায়। বৃষ্টির ঝরঝরানি এখনও আসেনি, গ্রীষ্মের খরতাপ এখনও কবির দেহকে দগ্ধ করেনি। এমন একটি ঋতু স্বভাবতই এর নাম দেওয়া হয়েছে বসন্ত। ওই সেই কথা ‘ফুল ফুটক না ফুটুক আজ বসন্ত।’ কৈশোরকাল থেকেই বাংলার ক্ষণস্থায়ী ঋতুগুলোর আমি পঞ্চমুখে প্রচারণা করতাম। সত্য কথা বলতে কী, বর্ষার রিমঝিম সুর ধ্বনিত হওয়ার আগে গ্রীষ্মের খরতাপ কবির হৃদয়কে দগ্ধ না করলে মনে হয় কাব্য নিঃসৃত হয় না। মনে হতো ৩টি জিনিস আমার চাই। এর একটি হলো কাম, নাম আর একটি হলো আরাম। আলসেমিও তখন সৃজনশীল লেখকের পেছনে লেগে থাকত। মনে হতো আজ নয়, কাল করব। এভাবে আমার ঋতুরাজ বসন্তের উপচানো দিনগুলো অতিবাহিত হতো। মাসগুলো চলে গেলে আলতো গ্রীষ্মের ধোঁয়া ওড়া, নিঃশ্বাস রোধ করা উষ্ণতা। তবে গ্রীষ্ম ছাড়া আমাদের জীবনে হাত ঘামে সিক্ত হয়_ এমন কোনো মাসকে আমরা হাতড়ে বেড়াতাম। আমাদের পুঁজি কম, রুজি বেশি। সবচেয়ে বড় কথা হলো খাদ্যের স্বাদ মাছ-মাংস, শাকসবজি সব কিছুতে যেন একটি অদৃশ্য প্রেরিত মজা লুকিয়ে আছে। আর ছিল ঘুম। মনে মনে ভাবতাম এই মাসে আমার এত ঘুম পায় কেন? এই নিদ্রা ছিল কবির নিদ্রা। স্বপ্নে সাজানো কল্পনায় রঞ্জিত। সব কাজেই আলসেমি, আজ নয় কাল। ঋতু নিয়ে আমরা কত কথাই তো বলি, কিন্তু হাতে ছোঁয়া যায় এমন ঋতু মাত্র অল্প কয়েকটিই আছে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। হেমন্ত আমাকে আনমনা করে উদাসীন কবিত্বের বোঝা বইবার শক্তি জোগায়। এ ছাড়া বসন্ত আমার কাছে মনে হয় বাংলার সারা বছরের আনন্দের উপার্জন। দু-একটি কবিতা খাতায় লেখা হলেও আলসেমির চিহ্নে আজ দেখি ডায়রি পূর্ণ হয়ে গেছে। আমি বিবেচনা করে দেখেছি, বসন্তের চেয়ে আরামদায়ক আলসেমিতে পরিপূর্ণ কবিত্বে জর্জরিত ঋতু আমাদের নেই। বসন্তের দিনগুলোকে প্রেমের মাসও বলা যায়। কবির ওপর বজ্রপাত না হলে কুহু বসন্তের নেশা কাটতে চায় না।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  অবুঝের সমীকরণ

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

আল মাহমুদ- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...