কবিতা

হে নটরাজ এবার তোমার নাচন থামাও

হে নটরাজ, এবার তোমার নাচন থামাও।
আর কতকাল নাচবে প্রভু? নাচন তোমার ভাল্লাগে না;
আর কতকাল?
আর কতকাল? এবার প্রভু ক্ষান্ত দেবে?
এখন তুমি আমায় ছাড়ো আমার কাছে।

আমার শরীর তোমারই মাল? তাও নিয়ে নাও,
ইচ্ছা হলে তাও নিয়ে যাও-
কেবল তুমি আমায় ছাড়ো আমার কাছে।
আমার দুঃখ আমার ঈর্ষা
আমার সেতার আমার শিরীষ-এবার তোমার নাচন থামাও।
এসব তোমার বিষয় আসয়? তোমার জিনিস? সব নিয়ে নাও।
আমার যত প্রশ্ন ছিল নিরুত্তরেই ফিরিয়ে নিলাম;
কোরান-কালো জিজ্ঞাসা আর ভূ- স্মৃতি,
কাঙ্গাল সকল সাব-সমাচার
১/১-এ হেয়ার স্ট্রিস্টের জানালা দিয়ে গড়িয়ে দিলাম।
তোমার বিষয়
তোমায় দিলাম। এবার প্রভু রেহাই দাও হে, রেহাই দেবে?

হে নটরাজ, রঙবাজি তো ঢের করেছো, আর কতকাল?
এখন তুমি আমায় ছাড়ো আমার কাছে।
সবটা তোমার জমিদারি? তাই নাকি হে? সবটা তোমার?
আমার আমি তোমার প্রজা?
তবে আর কিÑতাও নিয়ে নাও। কেবল তোমার পায়ে পড়ি,
তোমার নাচন থেকে এখন আমায় বাঁচাও।
হে নটরাজ, এবার তোমার নাচন থামাও ॥

ডিসেম্বরের বেলা
ডিসেম্বরের বেলা দেখতে দেখতে টেনে নেয় পাখা।
সূর্য পুরুষটি রোগা হাড্ডিসার, দিনমান গতরটা কুয়াশায় ঢাকা,
কখনো কখনো কাঁথা ছিঁড়ে গেলে পানসে রোদের ঘোলা জল
দেখা যায়, তাও চেটে খায়। কররেখা করে টলমল;
কিছুই তো করা হলো নাকো।
সন্ধ্যার নিয়মে আসে সন্ধ্যাকাল, সন্ধ্যাকাল রাত্রিতে গড়ায়।
‘জাগো’- এই অনুরোধ করে এক স্বপ্ন সাবালকদের ঠাসা ভিড়ে
কোথায় গা ঢাকা দিল। কোথায় যে খুঁজি তাকে! চেনা নেই রাস্তাঘাট,
যাইনি তো মাঠে নদীতীরে।
ঘুমের অন্তর্গত ঢুলুঢুলু জাগরণে হাই তুলি, খাঁ খাঁ শূন্য বুকে
ভয় পেয়ে ফের ঘন ঘুমের নিভৃতে ঢুকি। চোখের সুমুখে
দেওয়ালে বন্ধ ঘর, বারান্দা কি রক নেই, শুধু ঘেরা ঘর
ঘরের বাহিরে নেই, চারিদিকে দেখি শুধু ঘরের ভিতর।
হামাগুড়ি দাও আর এপিঠ ওপিঠ করো, ইচ্ছে হলে চিৎ হয়ে থাকো।
দিন কাটে, দিন-চাপা চুল থেকে রঙ ঝরে : কিছুই তো করা হলো নাকো।

মাঠের রাক্ষুসে হাঁয়ে শাঁসজল নিঙড়ে দিয়ে ভাগচাষী ছিবড়ে হয়ে ফেরে,
শাঁসজল অন্যদের খাদ্যদ্রব্য হয়ে ফের পাড়ি দেয় অচেনা বন্দরে।
নিঙড়ানো ফাঁকা চাষা অবশিষ্ট হাড়গোড় দেশমাতৃকার পায়ে দেয় অর্ঘ্যবলি
তুমি ভেবে রাগ করো, ঘুরে দ্যাখো ক্রোধটারই এ-গলি ও-গলি,Ñ
এইসব চাষাভুষো কোনোদিন ফেলবে না সশব্দ প্রবল থুথু? এইসব কালোকিষ্টি
মনুষ্যছায়ারা কবে শরীরপ্রাপ্ত হবে? পদাঘাত দেবে কবে? কবে দেবে অনাছিষ্টি?
ঘরে বসে ভেবে ভেবে প্রেশার বাড়িয়ে তোলো সুগারটা হাই করে রাখো।
ক্রোধ ক্রমে বিরক্তিতে খ্যাক করে, কিছুই তো করা হলো নাকো।
কঙ্কালের দেহতাপে কাঁচামাল পাকে, পাকা পণ্যে পুণ্যের শহর
টাল খায়। সব তাপ দিয়ে থুয়ে হিমদেহ কঙ্কালেরা শক্ত হিমতর
শয্যার জন্যে দিন গোনে। এইসব কঙ্কালের কাঠামোতে সেঁটে
দিতে হবে রক্তমাংস। আর কতকাল পায়ে চেটে
বেড়াব সায়েবদের? ঝড় তুলে রেষ্টুরেন্টে, পত্রিকায়, ব্যস্ত সেমিনারে সায়েবদের কত ছদ্ম বাকি? হঠাৎ কারেন্ট গেলে ইট চাপা বছর আঁধারে
এসে ফিসফিস করে, সব বন্ধ নারিন্দার ট্রাফিক জাম, নেই আর এতটুকু ফাঁকও।
বাখোয়াজি করে করে দিন গেলো, রাত কাটে, কিছুই তো করা হলো নাকো।

পদ্মানদীর মাঝি শ্রীচ্যুত কুবের এই জলের শ্যাওলা হয়ে ডাঙায় নেতিয়ে পড়ে রোজ
কোনো কোনো দিন খুব মাথা তুলি, একবার করে দেখি খোঁজ
তার জলেফাঁপা সব আঙুলে ফাঁক দিয়ে তারই ধরা শাদা ইলিশেরা
কী করে গলিয়ে পড়ে, কেন তার শূন্য দুই হাতে ঘরে ফেরা?
মাছ ধরা হয়ে গেলে মাছ আর তার মধ্যে কেন জোড়াহীন বিচ্ছিন্নতা?
এইসব ভেজা হাত আঙ্গুলিকে শক্ত করে দিতে চাই। অনন্তকালের সব প্রথা
ভেঙে ফেলি। উত্তরে অবসাদ। ধারালো কলমে জিভে যত হাঁকো ডাকোÑ
সংঘাত স্থগিত থাক। জীবন তো একবারই। কিছুই তো করা হলো নাকো ॥

ডিলান টমাস
আলো ভেঙে ভেঙে পড়ে যেখানে কোনো সূর্যই প্রজ্বলিত নয়
আলো ভেঙে ভেঙে পড়ে যেখানে কোনো সূর্যই প্রজ্বলিত নয়;
যেখানে সমুদ্র অপ্রবাহিত, হৃদয়ের জল
জোয়ারে এগোয়;
এবং, জোনাকি মাথায় কোরে অসম্পূর্ণ অশরীরিগণ,
আলোকের উপাদান
মাংসে সজ্জিত করে যেখানে কোনোই মাংস সাজায় না হাড়।

মোমবাতি উরুদের মাঝে
যৌবন এবং বীজ উত্তপ্ত করে আর দগ্ধ করে বয়েসের বীজ;
যেখানে কোনো বীজই আলোড়িত নয়,
মানুষের ফল হলো নিরুদ্বিগ্নÑ সমতল তারায় তারায়,
চকচকে, ডুমুরের মতো;
যেখানে কোনো মোমই নেই, মোমবাতি আপনার লোমকে দেখায়।

প্রত্যুষ ভেঙে পড়ে চোখের পেছনে;
করোটির মেরু আর পায়ের আঙ্গুল থেকে বাতাসিত রক্ত
সমুদ্রের নিঃশব্দে চলে;
অনাবৃত, রক্ষিত নয়, আকাশের আকস্মিক প্রবাহেরা সব
নলে বহির্গত
একটি হাসির মধ্যে কান্নার তৈলাক্তকে ঈশ্বরিত কোরে।
খাপে খাপে রাত্রি আবর্তিত,
কতিপয় অন্ধকার চাঁদের মতো, পৃথিবীর সীমা,
দিবস আলোক করে হাড়,
যেখানে কোনোই শীত নেই, চামড়া ছাড়ানো সব ঝড় খোলে শীতের গ্রন্থন;
চোখের পাতা থেকে দোলে বসন্তের ছবি।

আলো ভেঙে ভেঙে পড়ে গোপন বিস্তারে,
ভাবনার শীর্ষে শীর্ষে যেখানে ভাবনারা বৃষ্টিতে শোঁকে;
যুক্তিরা যখন গতায়ু,
চোখে হয় পৃথিবীও মাটির গোপন,
সূর্যে রক্ত লাফ দিয়ে ওঠে,
ভোর অবরুদ্ধ হয় নির্ধারিত নষ্ট সব, প্রান্তরের ’পরে।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (ফেব্রুয়ারি ১২, ১৯৪৩ - জানুয়ারি ৪, ১৯৯৭) একজন বাংলাদেশী কথাসাহিত্যিক। তিনি একজন স্বল্পপ্রজ লেখক ছিলেন। দুইটি উপন্যাস, গোটা পাঁচেক গল্পগ্রন্থ আর একটি প্রবন্ধ সংকলন এই নিয়ে তাঁর রচনাসম্ভার। বাস্তবতার নিপুণ চিত্রণ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক জ্ঞান, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ তাঁর রচনাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী সুষমা। বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ'র পরেই তিনি সর্বাধিক প্রশংসিত বাংলাদেশী লেখক। প্রাথমিক জীবনঃ আখতারুজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস ১৯৪৩ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার গোটিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম মঞ্জু। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বগুড়া জেলায়। তাঁর বাবা বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (১৯৪৭-১৯৫৩) এবং মুসলিম লীগে পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম বেগম মরিয়ম ইলিয়াস। আখতারুজ্জামান বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা এবং ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন (১৯৬৪)। কর্মজীবনঃ আখতারুজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াসের কর্মজীবন শুরু হয় জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক পদে যোগদানের মাধ্যমে। এরপর তিনি মিউজিক কলেজের উপাধ্যক্ষ, প্রাইমারি শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরিচালক, ঢাকা কলেজের বাংলার প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। কর্মজীবনে আখতারুজ্জামান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বিয়ে করেন। তাঁর স্ত্রীর নাম সুরাইয়া তুতুল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেন, গোপনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তাঁর লেখা প্রতিশোধ, অন্য ঘরে অন্য স্বর, খোঁয়ারি, মিলির হাতে স্টেনগান, অপঘাত, জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল, রেইনকোট প্রভৃতি গল্পে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতা। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠিত হলেও সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে বাকশালে যোগ দেওয়ার চাপ থাকলেও যোগ দেননি। সম্মাননাঃ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী বলেছেন, "কি পশ্চিম বাংলা কি বাংলাদেশ সবটা মেলালে তিনি শ্রেষ্ঠ লেখক।" লিখেছেন, "ইলিয়াস-এর পায়ের নখের তুল্য কিছু লিখতে পারলে আমি ধন্য হতাম।" ইমদাদুল হক মিলন বলেনঃ "গত ১৫-২০ বছরের মধ্যে তাঁর এ দু'টি উপন্যাসকে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।" ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। ১৯৯৬ সালে আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হন। সারা জীবন লড়াই করেছেন ডায়াবেটিস, জন্ডিস-সহ নানাবিধ রোগে। ১৯৯৭ সালের ৪ঠা জানুয়ারি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা কম্যুনিটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।