কবিতা

আমেরিকা: আপডেটেড

আমেরিকা, কলম্বাস কর্তৃক আবিস্কৃত
হে মহান গণতন্ত্রের দেশ -,
মানবাধিকারের হে অতন্দ্র প্রহরী!
তোমাকে সালাম, তোমাকে নমস্কার।

আমেরিকা, – আমি ভেবেছিলাম ,
সোভিয়েত ইঊনিয়নহীন পৃথিবীতে
তুমি আরো দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে।
তোমার দৈত্যদন্তগুলো ফেলে দিয়ে,
ক্রমশ মানুষ হয়ে উঠবে তুমি।

মানুষ কেন তার নিজ জীবনের চেয়ে
ভালোবাসবে তোমার ক্ষতিকে?
ভেবেছিলাম, ১১ সেপ্টেম্বরের পর,
ঘৃণার উৎস সন্ধানে ব্রতী হবে তুমি।
আমি ভেবেছিলাম, তুমি অতঃপর
আত্মঘাতী প্রাণের গভীরে প্রবেশ করে
বুঝতে চেষ্টা করবে তার ব্যথা।

কিন্তু আমেরিকা, শক্তিমদমত্ত বিশ্বপ্রভু,
ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহন না করে,
ইতিহাসকেই শিক্ষা দিতে চাইছ তুমি।
তাই, তোমার সন্দেহতাড়িত শক্তি,
অঢেল সম্পদের দম্ভ তোমার দৃষ্টিকে
আচ্ছন্ন করেছে, মদ যে রকম মাতালকে।

আমেরিকা, তুমি বুঝতে পারছো না-
নির্বান্ধবতার অন্ধ আবর্তের দিকে
কীভাবে ক্রমশ ধাবিত হচ্ছো তুমি।

আমেরিকা, তুমি বুঝতে পারছো না –
কীভাবে ক্রমশ তুমি পরিণত হচ্ছো
পাপ আর অন্যায়ের উৎসভূমিতে?

প্রপিতামহের সঙ্গে জোট বেঁধে –
জাতিসংঘকে বৃদ্ধ আঙ্গুল দেখিয়ে,

ধর্মনিরপেক্ষ ইরাককে ধ্বংস করে
তুমি তোমার নিজের গণ

বিধ্বংসী
দৈত্যমূর্তিকেই উলঙ্গ করেছো।

সাদ্দাম হোসেনের পুত্ররা
কী ক্ষতি করেছিল বুশ-কন্যাদের?
তুমি তাদের হত্যা করেছো কেন?

আফগানিস্তান ও ইরাকের অগণিত
শিশু-নারী আর নিরীহ মানুষকে
তুমি হত্যা করেছো -, তুমি খুনি।

তুমি বিন-লাদেনকে শিখন্ডি বানিয়ে
বিশ্বগ্রাসের যে নাটক সাজিয়েছো,
নিপাতনে সিদ্ধ হবে তার যবনিকা।

মানুষকে সহজেই বধ করা সম্ভব,
কিন্তু ভয় দেখিয়ে – মানুষ কেন?
কুকুরকেও বশ করা যায় না।
ভয় হচেছ ভূতের এজেন্ডা,
ইমপিরিলিজমের লিগেসি।

আমেরিকা, তুমি শোনো, আমি চাই –
তুমি রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ো,
আর সদাপ্রভু দয়াল যিশুর নামে
শুদ্ধচিত্তে তুমি পাঠ করো বাইবেল।

ট্রিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার খরচ করে
যে লৌহবাসর তৈরি করছো তুমি-
তাতে,- তাতে আর যাই থাক,
মিলনের আনন্দ থাকবে না।
আমেরিকা, তুমি একা হয়ে যাবে,
একা হয়ে যাবে,-বড় বেশি একা।

অ্যালেন গিন্‌সবার্গ বেঁচে থাকলে
এ কথাই তোমাকে বলতেন;
আর দুঃখ পেতেন বুশের বিজয়ে।

নির্মলেন্দু গুন
নির্মলেন্দু গুন
জন্ম: জুন ২১, ১৯৪৫ (আষাঢ় ৭, ১৩৫২ বঙ্গাব্দ), কাশবন, বারহাট্টা, নেত্রকোণা বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিদেরও একজন তিনি। মাত্র ৪ বছর বয়সে মা বীনাপনিকে হারান তিনি ৷ মা মারা যাবার পর তাঁর বাবা আবার বিয়ে করেন৷ শিক্ষাজীবন বারহাট্টা স্কুলে ভর্তি হন শুরুতে৷ স্কুলের পুরো নাম ছিলো করোনেশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইন্সটিটিউট। দুই বিষয়ে লেটারসহ মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ পান ১৯৬২ সালে৷ মাত্র ৩ জন প্রথম বিভাগ পেয়েছিল স্কুল থেকে৷ বাবা তাঁর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন- “কৃষ্ণ কৃপাহি কেবলম। মেট্রিক পরীক্ষার আগেই নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণের প্রথম কবিতা ‘নতুন কান্ডারী’৷ মেট্রিকের পর আই.এস.সি পড়তে চলে আসেন ময়মনসিংহেরআনন্দমোহন কলেজে৷ মেট্রিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের সুবাদে পাওয়া রেসিডেন্সিয়াল স্কলারশিপসহ পড়তে থাকেন এখানে৷ নেত্রকোণায় ফিরে এসে নির্মলেন্দু গুণ আবার ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকা ও তাঁর কবি বন্ধুদের কাছে আসার সুযোগ পান৷ নেত্রকোণার সুন্দর সাহিত্যিক পরিমন্ডলে তাঁর দিন ভালোই কাটতে থাকে৷ একসময় এসে যায় আই.এস.সি পরীক্ষা৷ ১৯৬৪ সালের জুন মাসে আই.এস.সি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডের ১১৯ জন প্রথম বিভাগ অর্জনকারীর মাঝে তিনিই একমাত্র নেত্রকোণা কলেজের৷ পরবর্তীতে বাবা চাইতেন ডাক্তারী পড়া৷ কিন্তু না তিনি চান্স পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগে৷ ভর্তির প্রস্তুতি নেন নির্মলেন্দু গুণ ৷ হঠাত্‍ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয় ঢাকায়৷ দাঙ্গার কারণে তিনি ফিরে আসেন গ্রামে৷ ঢাকার অবস্থার উন্নতি হলে ফিরে গিয়ে দেখেন তাঁর নাম ভর্তি লিষ্ট থেকে লাল কালি দিয়ে কেটে দেওয়া৷ আর ভর্তি হওয়া হলো না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ ফিরে আসেন গ্রামে৷ আই.এস.সি-তে ভালো রেজাল্ট করায় তিনি ফার্স্ট গ্রেড স্কলারশিপ পেয়েছিলেন৷ মাসে ৪৫ টাকা, বছর শেষে আরও ২৫০ টাকা৷ তখনকার দিনে অনেক টাকা৷ ১৯৬৯ সালে প্রাইভেটে বি.এ. পাশ করেন তিনি ( যদিও বি.এ. সার্টিফিকেটটি তিনি তোলেননি। ১৯৬৫ সালে আবার বুয়েটে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন৷কর্মজীবনঃ স্বাধীনতার পূর্বে তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সাংবাদিকতায়ও জড়িত ছিলেন।সাহিত্য ধারাঃ তিনি প্রধানত একজন আধুনিক কবি। শ্রেণীসংগ্রাম, স্বৈরাচার-বিরোধিতা, প্রেম ও নারী তার কবিতার মূল-বিষয় হিসেবে বার বার এসেছে। কবিতার পাশাপাশি ভ্রমণ কাহিনীও লিখেছেন। নিজের লেখা কবিতা এবং গদ্য সম্পর্কে তার নিজের বক্তব্য হলো - “ অনেক সময় কবিতা লেখার চেয়ে আমি গদ্যরচনায় বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। বিশেষ করে আমার আত্মজৈবনিক রচনা বা ভ্রমণকথা লেখার সময় আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে আমি যে গদ্যটি রচনা করতে চলেছি, তা আমার কাব্য-রচনার চেয়ে কোনো অর্থেই ঊনকর্ম নয়। কাব্যকে যদি আমি আমার কন্যা বলে ভাবি, তবে গদ্যকে পুত্রবৎ। ওরা দুজন তো আমারই সন্তান। কাব্যলক্ষ্মী কন্যা যদি, গদ্যপ্রবর পুত্রবৎ। ” বহুল আবৃত্ত কবিতাসমূহের মধ্যে - হুলিয়া, অসমাপ্ত কবিতা, মানুষ (১৯৭০ প্রেমাংশুর রক্ত চাই), আফ্রিকার প্রেমের কবিতা (১৯৮৬ নিরঞ্জনের পৃথিবী) - ইত্যাদি অন্যতম।