কবিতা

এসো, আমরা প্রেমের গান গাই

রাজা দেখলাম, রানী দেখলাম
এবার একটু মানুষের কাছে বসতে চাই।

এসো আমরা প্রেমের গান গাই।

এসো, আমাদের প্রিয় কবির কাছে যাই,
তাকে বলি:
আপনি গাছ ফুল পাখি ভালবাসেন
আপনি মানুষ ভালবাসেন-

‘প্রেমের গান গাইতে আমাদের গলা কেঁপে যায়;
আপনি আমাদের গান শেখান!’

রাজা দেখলাম, রানী দেখলাম
এবার আমরা আমাদের প্রিয় কবির কাছে ফিরে যাবো।
তিনি আমাদের সেই গান শেখাবেন
যা তুমি আর আমি গাইতে চাই।

এইসব ছাইপাশ কবিতা আর ভাল লাগে না।
আর ভাল লাগে না ওদের মুখের ওপর
ঘৃণার কবিতা ছুঁড়ে দিতে।

এ কোনো মানুষের জীবন নয়, কবির জীবন নয়।

কিন্তু আমাদের চারদিকে বড় বেশি অন্ধকার।
আমরা কবির কাছে যেতে চাই, কিন্তু অন্ধকার…

অন্ধকারে আলাদিনের দৈত্য আমাদের পথ রুখে দাঁড়ায়
সে আমাদের কাছ থেকে কবিতা লেখার খাজনা চায়
সে আমাদের আইন শেখাতে চায়।

এসো, তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিই, আমরা খাজনা দেবো না।
আমরা সেই রাজা মানি না যার কাছে প্রেমের গান কোনো গান নয়।
আমরা সেই রানী মানি না যিনি আমাদের ভয় দেখিয়ে খাঁচার
পাখি বানাতে চান।
তাকে আমরা সহজ, স্পষ্ট গদ্য ভাষায় আমাদের বক্তব্য বলবো;
তার জন্য, রাজা-রানীদের জন্য, কোনো ঘৃণার কবিতাও আর নয়।

তারপর অন্ধকারে যেদিকে দুচোখ যায়, আমরা এগিয়ে যাবো।
কবিকে না পাই, আমরা চিৎকার করে তাঁর কবিতা বলবো-
আমাদের বেসুরা গলায় হয়তো উচ্চারণ ঠিকমত হবে না,
হয়তো তাঁর প্রেমের গান কান্নার মত শোনাবে;
কিন্তু আমরা চেষ্টা করবো, আমাদের গান যেন কান্না না হয়
যেন আমাদের ভালোবাসা কবিতার আগুনে নম্র হয়, পবিত্র হয়-

মানুষের জন্য। আমরা মানুষকে স্পর্শ করতে চাই।
আমাদের প্রেমের গান
যদি গান হয়ে না ওঠে, তবু মানুষ আছে, মানুষ থেকে যায়…
তারপর নতুন কবিরা আসবে, শুদ্ধ উচ্চারণে তারা প্রেমের গান গাইবে…
আমরা তো শুধু রাস্তা হাঁটছি…
অন্ধকারে চলতে চলতে, আছাড় খেতে খেতে, বারবার ভুল
গান গাইতে গাইতে
তুমি আর আমি কান পেতে থাকবো
তুমি আর আমি কান পেতে থাকবো: ‘কে যায় অন্ধকারে ?’…
‘কে আসে ?’

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
কবিঃ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি | প্রেম, প্রকৃতি, চার পাশের মানুষ, সামাজিক আন্দোলন, ইত্যাদি তাঁর কবিতার মূল উপকরণ | তাঁর কাব্যকে ঘিরে আছে তীব্র সচেতনতা ও দায়বদ্ধতা | সমাজতন্ত্রের উপর বিশ্বাস এবং আস্থা তার কবিতা এবং জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে | ওই দৃঢ় বিশ্বাস এর জন্যই তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রত্যখ্য যোগদান, জেল যাত্রা এবং কবিতা | এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর দলের সঙ্গে মত বিরোধ এবং নিজেকে দল থেকে সরিয়ে আনা | তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে - গ্রহচ্যুত (১৯৪২), রাণুর জন্য (১৯৫২), লখিন্দর (১৯৫৬), ভিসা অফিসের সামনে (১৯৬৭), মহাদেবের দুয়ার (১৯৬৭), মানুষের মুখ (১৯৬৯), ভিয়েতনাম : ভারতবর্ষ (১৯৭৪), আমার যজ্ঞের ঘোড়া : জানুয়ারি (১৯৮৫) | এ ছাড়া তিনি অনেক কাব্যগ্রন্থ অনুবাদ করেছেন | তাঁর সম্পাদিত কবিতা বুলেটিনের সংখ্যাও পঁচিশের বেশি | কবির কবিজীবন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরনীয়, কারণ তিনি মূলত ছোট পত্রিকার কবি এবং তাঁর কোনো কবিতা কোনো বড় পত্রিকায় ছাপা হয় নি | কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা না থাকা সত্বেও তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন | ক্যানসারে আক্রান্ত অবস্থায়, শেষ শয্যায় অনেক অনুরোধে, তিনি তাঁর দুটি কবিতা একটি প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় ছাপার অনুমতি দিয়েছিলেন | তাঁর কবিতা সংক্ষিপ্ত এবং সংকেতময় | --- উত্স: ডঃ শিশির কুমার দাশ, সংসদ সাহিত্য সঙ্গী ২০০৩, ডঃ শর্মিষ্ঠা সেন