কবিতা

বন্ধুর জন্য বিজ্ঞাপন

আমি একটি বন্ধু খুঁজছিলাম যে আমার
পিতৃশোক ভাগ করে নেবে, নেবে
আমার ফুসফূস থেকে দুষিত বাতাস ;

বেড়ে গেলে শহরময় শীতের প্রকোপ
তার মুখ মনে হবে সবুজ চয়ের প্যাকেট, এখানে
ওখানে দেখা দিলে সংক্রামক রোগ,
ক্ষয়কাশ উইয়ে-খাওয়া কারেন্সি নোটের মতো আমার ফুসফুসটিকে
তীক্ষ্ণ দাঁতে ছিদ্র করে দিলে, সন্দেহজনকভাবে পুলিশ ঘুরলে
পিছে, ডবল ডেকার থেকে সে আমাকে
ফেলে দেবে কোমল ব্যান্ডেজ, সে আমাকে ফেলে দেবে
ট্রান্সপেরেন্ট পাদুর রুমাল, আমি যাবো পাথি হয়ে পুলিশ-স্কোয়াড
থেকে
জেনেভায় নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে, বলবো-
আমি প্রেমিকার পলাতক গুপ্তচর ;

সে এসে অন্ধকারে চতুর চেরের মতো
আমার পকেট থেকে নেবে সব স্তলপদ্মগুলি
বলবে কনের কাছে চুপিচুপি অসম্ভব বদমাশ সে,
-চল্‌ ঘুরে আসি রাতের শো থেকে
তারপর নিয়ে যাবে ক্রমাগত ভুল ঠিকানায়
তবু সেই ভীষণ বদমাশটা আমার সমস্ত ভুল ভাগ করে নেবে,
ওর সমস্ত পাপ লিখে যাবে আমার ডায়েরিতে
আমার পাপ হাতে নিয়ে ধর্মযাজকের মতো অহঙ্কারে ঢুকবে গির্জায়

আমি এই ঢাকা শহরের সর্বত্র, প্রেসক্লাবে, রেস্তরাঁয়, ঘোড়দৌড়ের
মাঠে এমন একজন বন্ধু খঁজে বেড়াই যাকে আমি
মৃত্যৃর প্রাক্কালে উইল করে যাবো এইসব অবৈধ সম্পত্তি, কুৎসা
আমার লাম্পট্য, পরিবর্তে সে আমার চিরদিন যোযাবে ঘুমের ওষুধ
আমার অপরাধের ছুরি রেখে দেবে তার বুকের তলায়, আমার
পিতার কাছে
চিঠি দেবে এই বলে-ওর কথা ভাববেন না, ও বড়ো ভালো ছেলে
নিয়মিত অফিস করে দশ টা পাঁচটা ; অথচ সে জানবে আমার
সব বদঅভ্যাস, স্বভাবের যাবতীয় দোষ
তবু সে যাবে আমার সাথে ক্যামেরায় ফিল্ম ভর্তি করে
নিয়ে আত্মহত্যাকারী এক যুবকের ছবি তুলে নিতে, অবশেষে
মফস্বল শহরগামী কোনো এক ট্রেন চড়ে নেমে যাবে
আমার সাথে ভুল ইস্টিশনে;

এখনে ওখানে সর্বত্র আমি একটি বন্ধু খুঁজছিলাম
যে আমাকে নিয়ে যাবে সুন্দরবনে হরিণ শিকারে, হরণের শিং থেকে
তার স্বচ্ছ খুর থেকে খুঁটে নেবে দামী অংশগুলি যেন ও গাভীর
খুর থেকে বানাবে বোতাম, সে
আমাকে প্রতিদিন ধার দেবে লোভ, এখনে
সেখানে শহরের পরিচিত অঞ্চলগুলিতে আমি সেই করল সাঙাতটিকে
খুঁজি, আমি শুধু সারাজীবন একটি বন্ধুর জন্য প্রত্যহ বিজ্ঞাপন দিই
কিন্তু হায়, আমার ব্লাডগ্রুপের সাথে
কারো রক্ত মেলে না কখনো।

মহাদেব সাহা
মহাদেব সাহা
(জন্ম: ৫ আগস্ট ১৯৪৪) বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালের একজন অন্যতম প্রধান কবি।১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট পাবনা জেলার ধানঘড়া গ্রামে পৈতৃক বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বগদাধর সাহা এবং মাতা বিরাজমোহিনী।তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৯৩ টি। কাব্যগ্রন্থ এই গৃহ এই সন্ন্যাস (১৯৭২), মানব এসেছি কাছে, চাই বিষ অমরতা, কী সুন্দর অন্ধ, তোমার পায়ের শব্দ, তবু স্বপ্ন দেখি, সোনালী ডানার মেঘ, পৃথিবী তোমাকে আমি ভালোবাসি, কে পেয়েছে সব সুখ, সবটুকু মধু,, শুকনো পাতার স্বপ্নগাঁথা, দুঃসময়ের সঙ্গে হেঁটে যাই, দুঃখ কোন শেষ কথা নয়, ভালোবাসা কেন এতো আলো অন্ধকারময়, লাজুক লিরিক-২, দূর বংশীধ্বনি, অর্ধেক ডুবেছি প্রেমে - অর্ধেক আধারে, কালো মেঘের ওপারে পূর্ণিমা, সন্ধ্যার লিরিক ও অন্যান্য, মহাদেব সাহার রাজনৈতিক কবিতা (কাব্য-সংকলন), মহাদেব সাহার প্রেমের কবিতা (কাব্য-সংকলন), মহাদেব সাহার কাব্যসমগ্র (কাব্য-সংকলন) - ১ম খণ্ড, ২য় খন্ড, ৩য় খন্ড, ৪র্থ খন্ড, মহাদেব সাহার শ্রেষ্ঠ কবিতা (কাব্য-সংকলন), প্রেম ও ভালবাসার কবিতা (কাব্য-সংকলন), নির্বাচিত ১০০ কবিতা (কাব্য-সংকলন), নির্বাচিত একশ (কাব্য-সংকলন), প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতা(কাব্য-সংকলন), প্রবন্ধ আনন্দের মৃত্যু নেই মহাদেব সাহার কলাম কবিতার দেশ ও অন্যান্য ভাবনা মহাদেব সাহার নির্বাচিত কলাম শিশুসাহিত্য টাপুর টুপুর মেঘের দুপুর ছবি আঁকা পাখির পাখা আকাশে ওড়া মাটির ঘোড়া সরষে ফুলের নদী আকাশে সোনার থালা মহাদেব সাহার কিশোর কবিতা পুরস্কার ও সম্মাননা --------------------------------- মহাদেব সাহা তাঁর কাব্য প্রতিভার জন্য অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি ১৯৮৩ সালে কবিতায় বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়াও অন্যান্য পুরস্কার ও সম্মননার মধ্যে ১৯৯৫ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার, ২০০২ সালে খালেদদাদ চৌধূরী স্মৃতি পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার অন্যতম।