কবিতা

ভয় যদি ভেঙে ফেলি

আমি এরকমই বটে- যা কিছু বলতে চাই
কেন যেন পয়ারেই ঘটে
মাঝেমধ্যে বিরক্তিও লাগে;
আমি চাই পয়ারের
ডান্ডাবেড়ি থেকে মুক্ত হয়ে
অবারিত নীলিমায় উড়ে বেড়ানোর স্বাধীনতা-
যদিও পয়ার দীর্ঘকাল ধরে বাঙালি সংস্কৃতি
নিজের দখলে রেখে বেশ শাসন করেছে কাব্য-
তবু আজ মুক্তি চাই কৃত্তিবাস কাশীরাম থেকে!
বাঙলার সম্পন্ন ছন্দ জানি আমি পয়ার পয়ার:
তবু এই একবিংশ শতাব্দীতে রফিক আজাদ
আবদ্ধ থাকবে কেন অনিবার্য পয়ার-বন্ধনে!
আমি কি পয়ার-দাস কাশীরাম এই বঙ্গভূমে-
আমার মুক্তি কি তবে নয় দীপ্র আলোয় আলোয়?
আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকবো চিরকাল পয়ার-নিগড়ে
আমার কি মুক্তি নেই অবারিত শ্যামল প্রান্তরে?
পূর্ব পুরুষের ছন্দটিকে উপেক্ষা করার সাধ্য
তাহলে কি নেই কারো?
স্মরণ অতীত কাল থেকে আজও অব্দি
পয়ারই তো শাসন করছে
তার কাব্য বঙ্গভূমে, এমনকি, সংস্কৃতিমণ্ডল!
শব্দ যদি নাদব্রহ্মা, নির্ভর করবে সে পয়ারেই-
কে না জানে অন্য ছন্দ এত ভার বহনে অক্ষম!
অতএব, পয়ার এখনও পায়ে বয়ে নিয়ে যেতে
সমুদয় আবর্জনা, আধুনিক বাঙালির দায়,
ব্যর্থতার বিবরণ, ক্বাথ, শ্লেষ্মা বঙ্গোপসাগরে!
পয়ার বহত নদী- তার সামনে এই
মেঘনা-যমুনা পদ্মা বড় কোনো স্রোতস্বিনী নয়-
উচ্চারিত বাক্যমাত্র পয়ারে স্ফুরিত হতে পারে।
যুগে যুগে কত মহাজন
পয়ারে জলে পুণ্যস্নান সেরে উঠে এসেছেন
বাঙলা-কাব্যের ওই সমুজ্জ্বল সমৃদ্ধ ভবনে
কে না জানে!
তার পরও পয়ারের ডান্ডাবেড়ি থেকে মুক্তি চাই;
আকৈশোর আমি নিয়ম-না-মানা এক
বিষম স্বপ্নের ঘোরে-চালিত মানুষ!
নিয়মের নিগড় আমায় বেঁধে ফেলতে পারে নাই;
সারাটা জীবন ব্যোপে ব্যক্তিগত আমার সময়
কখনও ছিল না নিয়ম-শৃঙ্খলে বাঁধা,
থাকি নাই বাঁধা কোনোকালে
অলীক গোয়ালে কোনো!
ব্যতিক্রমী ছন্দে আমি সমর্পিত এবং আগ্রহী
কিন্তু তবু পয়ারেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি-
ব্যক্তিগত জীবনে মানুষ
আপাতদৃষ্টিতে হতে পারে বিশৃঙ্খল, এলোমেলো;
কিন্তু অন্তর্গত সত্তা তার যদি বা সুব্যবস্থিত হয় তবে
কী দোষ বর্তায় তা-তে?
পয়ার চিরক্তিকর, পুনরুক্তিময় এই ছন্দ
ভেঙে ফেলে দিতে চাই-
কিন্তু ভয়-যদি ভেঙে ফেলি পুরো প্রিয় মূর্তিটাই?

রফিক আজাদ
রফিক আজাদ
জন্ম রফিক আজাদ(১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১ - ১২ মার্চ, ২০১৬) ১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানার গুণী গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সলিম উদ্দিন খান ছিলেন একজন প্রকৃত সমাজসেবক এবং মা রাবেয়া খান ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। দুই ভাই-এক বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। প্রকৃতার্থে তারা ছিলেন তিন ভাই-দুই বোন। কিন্তু তার জন্মের আগে মারা যায় সর্বজ্যেষ্ঠ ভাই মাওলা ও তৎপরবর্তী বোন খুকি। রফিক আজাদ যখন মায়ের গর্ভে তখন অকাল প্রয়াত বড় বোন অনাগত ছোট ভাইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘জীবন’। রফিক আজাদ ‘জীবনের’ই আরেক নাম। শিক্ষাজীবনঃ ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র রফিক ভাষা শহীদদের স্বরণে বাবা-মায়ের কঠিন শাসন অস্বীকার করে খালি পায়ে মিছিল করেন। ভাষার প্রতি এই ভালোবাসা পরবর্তী জীবনে তাকে তৈরি করেছিল একজন কবি হিসেবে, আদর্শ মানুষ হিসেবে।১৯৫৬ সালে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় একবার বাবার হাতে মার খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন বাড়ি থেকে। উদ্দেশ্য, পি.সি সরকারের কাছে ম্যাজিক শেখা। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ স্কুলের হেডমাস্টার তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়িতে পাঠান। কৈশোরে লাঠি খেলা শিখতেন নিকটাত্মীয় দেলু নামক একজনের কাছে। তিনি সম্পর্কে রফিক আজাদের দাদা। দেলু দাদা ছিলেন পাক্কা লাঠিয়াল। গ্রামে নানা কিংবদন্তির প্রচলন ছিল তার নামে। সলিম উদ্দিনের চেয়ে তিনি বয়সে বড় হলেও গা-গতর দেখলে পালোয়ান বলেই মনে হতো। দেলু দাদা খুব আদর করতেন রফিক আজাদকে। বার-বাড়িতে শিক্ষা দিতেন লাঠি খেলা। এছাড়া গুণী গ্রামের পাশেই মনিদহ গ্রাম। এখানকার ষাট শতাংশ অধিবাসী ছিল নিম্নশ্রেণীর হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। সুতার, ধোপা, দর্জি, চাষা ইত্যাদি। এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরাই ছিল রফিক আজাদের শৈশব-কৈশোরের বন্ধু। সাধুটী মিডল ইংলিশ স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণী পাস করে ভর্তি হলেন কালিহাতি রামগতি শ্রীগোবিন্দ হাই ইংলিশ স্কুলের নবম শ্রেণীতে। বাড়ি থেকে প্রায় তিন-চার মাইল দূরত্বে স্কুল। কালিহাতি সংলগ্ন গ্রাম হামিদপুরের এক দরিদ্র গেরস্থের বাড়িতে পেইং গেস্ট হিসেবে থেকে তিনি পড়াশোনা করেন। হামিদপুরে আগের মতো আর সেই বিধিনিষেধ নেই। কালিহাতি হাই স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সতীর্থ মাঈন উদ্দিন আহমদের সঙ্গে। সে ছিল ক্লাসের ফার্স্ট বয় এবং অত্যন্ত মেধাবী। সাহিত্যপাঠে আগ্রহ ছিল তার। এই মাঈনই রফিক আজাদের আড্ডার প্রথম গুরু। হামিদপুরে তার সঙ্গে শুরু হয় তুখোড় আড্ডা। তার মুখেই প্রথম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শোনেন। দিবারাত্রির কাব্য, পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি প্রভৃতি উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত হন। মাঈন একদিন সন্ধ্যাবেলা ফটিকজানি নদীর তীর ঘেঁষা ডাকবাংলোর বারান্দায় বসে রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি পুরো আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল তাকে। সেই কবিতা শুনে স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন কিশোর রফিক আজাদ। অবাধ স্বাধীনতা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় পড়ে নবম শ্রেণীতে ভালোভাবে পাস করতে পারলেন না আড্ডাপ্রিয় রফিক আজাদ। মাঈনও প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানে চলে আসে। আড্ডার অন্য বন্ধুদের অনেকেই একাধিক বিষয়ে ফেল করে বসল। সারা বছর অহেতুক আড্ডা দিয়ে পরীক্ষায় এই দশা। অবশেষে ব্রাহ্মণশাসন হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন। কর্মজীবনঃ রফিক আজাদ বাংলা একাডেমীর মাসিক সাহিত্য পত্রিকা উত্তরাধিকার এর সম্পাদক ছিলেন। রোববার পত্রিকাতেও রফিক আজাদ নিজের নাম উহ্য রেখে সম্পাদনার কাজ করেছেন। তিনি টাঙ্গাইলের মওলানা মুহম্মদ আলী কলেজের বাংলার লেকচারার ছিলেন। রফিক আজাদের প্রেমের কবিতার মধ্যে নারীপ্রেমের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে।রফিক আজাদ ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা৷ তিনি ১৯৭১ সালেকাদের সিদ্দিকীর সহকারী ছিলেন ।