কবিতা

কোথায় – হাফিজ

অনুবাদ: সুভাষ মুখোপাধ্যায়

ওদিকে রয়েছে পুণ্যকর্ম
এদিকে রয়েছি আমি দুরাচার ;
চেয়ে দেখ, এই দুয়ের মধ্যে
রচে ব্যবধান অকূলপাথার ।

মঠমন্দির নামাবলীভেখ
ওতে মন নেই, ছেড়েছি ওসব;
কোথা কোণার্ক, কোথা সদগুরু
কোথায় মিলবে শুদ্ধ আসব ?

সংযম আর সৎকর্মের
সঙ্গে কী যোগ মধ্যপানের ?
উপদেশ-কথামৃতের সঙ্গে
আওয়াজে কী মিল থাকবে গানের ?

চোখে যদি ভাসে বন্ধুর মুখ
তবে কোন ভাব হবে শত্রুর ?
কোথাও হয়ত জ্বলছে না বাতি,
কোথাও আবার ঠাঠা রোদ্দুর ।

যেখানে তোমার দেহলির ধুলো
আমার আখিঁতে কাজল পরায়,
বলে দাও,প্রভু, অন্য কোথায়
চলে যেতে হবে ছেড়ে এ ঠাঁই ।

আপেলের মত প্রিয়ার চিবুক
তার মাঝে এক কুয়ো আছে জেগে;
মন, তুমি এই সব কিছু ছেড়ে
কোথায় চলেছ হন্ হন্ বেগে !

আমরা যে মিলেছিলাম একদা
সে সুখস্মৃতির হল অবসান;
কী করে আপনি মিলাল সে সব
সে মোহিনী মায়া, সেই অভিমান !

বন্ধু আমার, হাফিজের কাছে
সুখ বা স্বস্তি করো না কো আশা ;
জানে না সে কাকে বলে তিতিক্ষা,
শান্তি কোথায় ? তার জিজ্ঞাসা ।।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়
সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ – ৮ জুলাই ২০০৩) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভারতীয় বাঙালি কবি ও গদ্যকার। কবিতা তাঁর প্রধান সাহিত্যক্ষেত্র হলেও ছড়া, রিপোর্টাজ, ভ্রমণসাহিত্য, অর্থনীতিমূলক রচনা, বিদেশি গ্রন্থের অনুবাদ, কবিতা সম্পর্কিত আলোচনা, উপন্যাস, জীবনী, শিশু ও কিশোর সাহিত্য সকল প্রকার রচনাতেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সম্পাদনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ এবং বহু দেশি-বিদেশি কবিতা বাংলায় অনুবাদও করেছেন স্বচ্ছন্দে। তাঁর কবিতা চড়া সুরে বাঁধা হলেও ছিল অনেক সহজবোধ্য। কথ্যরীতিতে রচিত তাঁর কবিতায় ছিল ব্যঙ্গ, সংহত আবেগের প্রকাশ ও নিপূণ শিল্পকলার অভিপ্রকাশ। ১৯৪০-এর দশক থেকে তাঁর অ-রোম্যান্টিক অকপট কাব্যভঙ্গী পরবর্তীকালের কবিদের কাছেও অনুসরণীয় হয়ে ওঠে। সমাজের তৃণমূল স্তরে নেমে গিয়ে সেই সমাজকে প্রত্যক্ষ করে তবেই কবিতা রচনায় প্রবৃত্ত হতেন তিনি। আদর্শ তাঁর কবিতাকে দিয়েছিল অভাবনীয় জনপ্রিয়তা। তবে কবিতার মাধ্যমে একটি বার্তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে গিয়ে তিনি কবিতাকে রসহীন ও সৌন্দর্যহীন করে ফেলেননি; এখানেই তাঁর কৃতিত্ব। বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে শেষ জীবনে। কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে হন বিতর্কিত। কিন্তু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর হিমালয়প্রতিম অবদান অনস্বীকার্য। “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্যএসে গেছে ধ্বংসের বার্তা” বা “ফুল ফুটুক না ফুটুক/আজ বসন্ত” প্রভৃতি তাঁর অমর পংক্তি বাংলায় আজ প্রবাদতুল্য। ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর কলকাতা মেট্রো নিউ গড়িয়া স্টেশনটি কবির নামে উৎসর্গ করে, এই স্টেশনটি বর্তমানে "কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন" নামে পরিচিত।