থানা গারদ থেকে

তুমি এখন ছাদের আলসেতে
হয়ত কাপড় মেলছো ,মাগো ।
আমাদের বাড়ীর সামনের কাঠাল গাছটার ভারী ভারী পাতাগুলোর বুকে
সুর্যের কিরণ হয়ত এখন ছক ছক করছে ।
আর একটু পরে হয়ত তুমি লাল পেড়ে সেই গরদের শাড়িটা পরে আহ্নিক সারতে বসবে
তোমার ভেজা
ভেজো এলো চুল গুলো থাকবে পিঠের উপর ছড়িয়ে
আর আমি অন্ধকারের চেয়েও কালো একটা পুলিশ ভ্যানের গহ্বরে বসে
জনা বিশেক রাইফেল ধারীর পাহারায় আর একটু পরে
থানা গারদের অন্ধকার থেকে
পৌছে যাব ছোটা বিচারালয়ের আঙ্গিনায় ।
সুন্দরবনের কোন এক গ্রাম থেকে,
গত পরশু সন্ধ্যায় ওরা আমাকে গ্রেফতার করেছে ।
থানা গারদের অহিংসার প্রেমে
ওরা উৎপাঠিত করেছে আমার দু হাতের প্রতিটি নখ
আঙ্গুলগুলোকে বিষাক্ত করেছে রাইফেলের খুদোয় তেথলে তেথলে
কেননা ,ওদের বিশ্বাস আমার হাত দুটো নাকি বোমা বানাতে ভীষন ওস্তাদ ছিল।
মাঝরাতে ,ঠিক মাঝরাতে যখন বাইরের পৃথিবীটা গভীর ঘুমে অচেতন
তখন ওরা আমার প্রায় অচেতন দেহটাকে বউ বাজারের মোড়ের দোকানে
শুন্যে ঝোলানো ছাল ছড়ানো পাঁঠার মত
ঝুলিয়ে দিয়েছিল গারদের কড়ি কাঠে
পৈশাচিক হিংসায় বিদ্বস্থ করেছিল আমার পায়ের হাড় গুলোকে
কেননা ওদের বিশ্বাস আমার পা দুটো নাকি খরগোসের ছেয়েও ক্ষীপ্র ছিল।
শেষ রাতে, শেষ রাতে ওরা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল
ডি আই বি র বড়বাবুর পাদমন্দিরে
চালতার মত মুখওয়ালা কুত কুথে চোখ এক অফিসার
বধিদ্রুম বৃক্ষথলে বুদ্বের মতন করুনার হাসি বিলিয়ে
প্রশংসা করেছিল আমার পারিবারিক আভিজাত্যের,শিক্ষা দীক্ষার, আর বংশ কৌলিন্যের ।
আমার মত বনেদী বংশের এই দেশদ্রোহী হওয়া নাকি একান্তই মর্মান্তিক ।
অতএব, সুতরাং আমার পবিত্র কর্তব্য ধীরে ধীরে বলে ফেলা
কোথায় আছে আমাদের কমরেডরা,কোথায় আছে আমাদের অস্ত্র ভান্ডার ।
অবশ্য ডি আই বি র বড় বাবুও চান দেশে বিপ্লব হোক
বিপ্লব না হলে দেশের কোন পরিবর্তন হওয়াটা যে অসম্ভব।
আর সেই বিপ্লব আসবে ঐ থানা বাবুদের হাত ধরে ,
ঘুষের টাকার মতই নিঃশব্দে।
এবং আমার মুখ থেকে কোন কথা আবিস্কার করতে না পেরে
বুদ্বদেব মুহুর্তেই হয়ে উঠলেন ,
গোপাল পাঁঠার দোকানের পাঁঠা কাটা ষন্ডা কসাইটার মত ।
আমার নাকে ছেদা দুটো তার আদরের রক্তে বুঝে গেল ,
ছোয়ালের ভেতর থেকে খসে গেল দুটো দাঁত
নিজের রক্তের স্বাধ জিভ দিয়ে ছেটে
আমি পেয়ে গালাম প্রতিরোধের উদ্দাম ইশারা।
তুমি এখন হয়তো আনাজ কাটতে বসতে মাগো
বারান্দার উপর হয়তো ঘুর ঘুর করবে ঠ্যাং খোড়া সেই শালিকটা
আর পৃথিবীর বৃহত্তম গনতান্ত্রিক দেশের সুমহান নাগরিক আমি
হাতে হাত কড়া,সারা দেহে ফোলা ফোলা গাঁ
আর রক্তের আলপনা নিয়ে একটু পরেই হাজির হবো
সপ্তমেব জয়তে অংকিত মহান বিচারালয়ের সত্য ভুমিতে
ওরা গতকাল অবশ্য সারাটাদিন আমাকে বিশ্রাম দিয়েছে
সহস্র মাছিকে আমার সারা দেহের ঘা গুলোকে ছাটতে দিয়েছে অবিশ্রান্ত সুযোগ
ফার্নেসের উত্তাপ গায়ে নিয়ে ,প্রসাবের দুর্গন্ধযুক্ত গারদের সুন্দর কন্টিতে বসে
ঝিমিয়েছে আমার শরীর
রাত হতেই বেওয়ারিশ মরার মত আমার সেই শরীরটা গিয়ে পৌঁছেছে
লর্ড সেনা রোডের সদ্য ভুমিতে
ওরা আমার শরীরে প্রবাহিত করেছে বিদ্যুৎ তরঙ্গ
ওরা আমার ফোলা ফোলা বিভৎস গাল দুটোতে লাগিয়েছে জলন্ত তিলকের ছ্যাকা
ওরা আমার গুহ্যদ্বারে ঢুকিয়েছে তপ্ত লোহা,
ওরা আমার প্রস্রাবের নালীতে ফুটিয়েছে সুঁচ
ঠান্ডা দেহের উপর দাঁড় করিয়ে,ওরা আমার দেহটাকে করেছে আরো উত্তপ্ত
আর রসিক অফিসার স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য
সহস্র প্রশ্নের সাথে সাথে কুৎসিত ইঙ্গিত করেছে
আমাদের নারী কমরেডদের প্রতি।
ওদের সামনে আমি একবারই মুখ খুলেছিলাম ,মাগো
তা তাদের মুখে আমার একমুখ থু থু উজার করে দেবার জন্য ।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  আঠারো বছর বয়স

মাগো তুমি এখন হয়তো আমার কথাই ভাবছ
তোমার পায়ের কাছে মিউ মিউ করছে আমার পোষা বিড়ালটা
তুমি ভাবছ আমার ফেরার হয়ে যাওয়া ছেলেটা বন বাদারে কি কষ্টেই না দিন কাটাচ্ছে।
আর সেই আমি একটু পরেই মাহয়া সুখে পৌঁছে যাব
স্বাধীন ভারতের সুমহান বিচারালয়ের কাঠে
থানার অফিসার
আমাকে আরো কয়েকদিন পুলিশি গারদে রাখতে চান
কেননা আমি নাকি
ভারত বিপ্লবের তাজা খবর আর বারুদের ডিপো
ওদের বিচারে মাগো দেশকে ভালোবাসাটা প্রচন্ড দেশদ্রোহিতা
ওদের বিচারে শোষন মুক্তির জন্য সংগ্রাম করাটা মর্মান্তিক ব্যাভিচার
শোষনের লৌহ শৃংখল বেয়ে চুর্ন বিচুর্ন করা বেআব্রু বেহায়া
ওরা তাই আজ আমাদের হত্যা করছে রাজপথে,
জনপথে, ধান খেতে, মিল গেটে, অলিতে গলিতে
দেশকে ওরা বেঁধে ফেলেছে রাইফেল আর কার্পুর বুলেটে
কিন্তু শেষের বুলেট আর পৈশাচিক নিপীড়ন দিয়ে
ইতিহাসের অগ্রগতিকে রুখতে চায় কোন আহন্মকের দল
মেহনতি মাসুষের প্রতিরোধ সংগ্রামকে রোধ করতে
কোন হিটলার আজ শহরের রাস্তায়।
শোষিতের প্রতিটি ঘরে আজ

(অসমাপ্ত)

      10 Thana Garod Theke - Kamrul Hasan Monju

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

সৃজন সেন- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...