কবিতা

বাইবেলের কালো অক্ষর

জো, তুমি আমাকে চিনবে না।
আমি তোমারই মতো একজন কালো মানুষ
গলার সবচেয়ে উঁচু পর্দায় গাইছি সেতুবন্ধের গান,
যে গানে তোমার দিলখোলা সুরও লাগছে।

জো, যখন ওরা তোমার চামড়ায় জ্বালা-ধরানো
সপাং সপাং চাবুক মারে আর
হো হো করে হেসে ওঠে,
তখন কাল সেঠে পড়ে সভ্যতার পিঠে
যখন ওরা বুট জুতো মোড়া পায়ে মারে তোমাকে,
তখন ধূলায় মুখ থুবড়ে পড়ে মানবতা।
জো, যখন ওরা তোমাকে হাত পা বেঁধে নির্জন রাস্তায় গার্বেজ ক্যানের পাশে ফেলে রাখে,
তখন ক্ষ্যাপাটে অন্ধকারে ভবিষ্যৎ কাতরাতে থাকে, গা’ ঝাড়া দিয়ে ওঠার জন্যে।
যদিও আমি তোমাকে কখনো দেখিনি জো,
তবু বাইবেলের কালো অক্ষরের মতো তোমার দুফোঁটা চোখ
তোমার বেদনার্ত মুখ বারংবার
ভেসে ওঠে আমার হৃদয়ে,
তোমার বেদনা এশিয়া, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকায় ব্যাপ্ত,
জো, আমি একজন ফাঁসির আসামীকে জানতাম
যিনি মধ্যরাতে আবৃতি করতেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা
আমি এক সুদর্শন যুবাকে জানতাম যে দৈতার মান রাখার জন্যে
জান কবুল করেছিল আমাদের একাত্তুরের মুক্তিযুদ্বে
আমি একজন যাব্বজীবন কারাবন্দীকে ত্যাজী নেতাকে জানতাম
দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠে যিনি কোন কোন রাতে
তার শিশু কন্যাকে একটু স্পর্শ করার জন্যে,
ওর মাথার ঘ্রান নেয়ার জন্যে উদ্বেল আর ব্যাকুল হয়ে আঁকড়ে ধরতেন কারাগারের শিক ।
আমি এমন এক তরুনের কথা জানতাম
যে তার কবিতার আলালের ঘরের দুলাল
মেনিমুখো শব্দাবলী ছেড়ে ফেলে ,অপেক্ষা করতো সে দিনের জন্যে
যে দিন তার কবিতা হবে সুর্যোমুখী ভাসনের মত ।
যখন তাদের কথা মনে পড়ে
তখন তোমার কথা নতুন করে ভাবি জো,
জো, যখন তোমার পাঁচ বছরের ছেলের বুক থেকে রাস্তায় ওরা ছড়ায় টকটকে লাল রক্ত
যেমন পিরিছে ডেলে দেয় কফি ,
জো,যখন তোমার পোয়াতি বউ হায়েনাদের দৃষ্টি থেকে পালানোর জন্যে দৌড়তে দৌড়তে মাঝ পথে হুমরি খেয়ে পড়ে
জো,যখন তোমার সহোদরকে ওরা লটকিয়ে দেয় ফাসিতে
তখন কাঁচা দুধের ফেনার মত
ভোরের সাদা আলোয়
বাইবেলের কালো অক্ষর ঘুলো আর্তনাদ করতে করতে হঠাৎ বিদ্রোহী হয়ে উঠে ।

      08 Bible Er Kalo Okkhor ghulo - Kamrul Hasan Monju,Moushumi Mitro
শামসুর রাহমান
শামসুর রাহমান
শামসুর রাহমান (জন্মঃ অক্টোবর ২৪, ১৯২৯, মাহুতটুলি, ঢাকা - মৃত্যুঃ আগস্ট ১৭, ২০০৬ ) বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে দুই বাংলায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠিত। তিনি একজন নাগরিক কবি ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লিখিত তাঁর দুটি কবিতা খুবই জনপ্রিয়। জন্ম, শৈশব ও শিক্ষাঃ জন্ম নানাবাড়িতে। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মা আমেনা বেগম। পিতার বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরায় পাড়াতলী গ্রামে। কবিরা ভাই বোন ১৩ জন। কবি ৪র্থ। পুরোনো ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ১৯৪৫ সালে। ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হন এবং তিন বছর নিয়মিত ক্লাসও করেছিলেন সেখানে। শেষ পর্যন্ত আর মূল পরীক্ষা দেননি। পাসকোর্সে বিএ পাশ করে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এম এ (প্রিলিমিনারী) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। পেশাঃ শামসুর রাহমান পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। এরপর তিনি আবার ফিরে আসেন তার পুরানো কর্মস্থল দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। তিনি সেখানে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[১] নভেম্বর, ১৯৬৪ থেকে শুরু করে সরকারি দৈনিক দৈনিক পাকিস্তান এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৭ এর জানুয়ারি পর্যন্ত (স্বাধীনতা উত্তর দৈনিক বাংলা)। ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ তে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাকেঁ পদত্যাগ বাধ্য করা হয়।অতঃপর তিনি অধুনা নামীয় মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুঃ কবি শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের ১৭ই আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬ টা বেজে ৩৫ মিনিটে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ঢাকাস্থ বনানী কবরস্থানে, তাঁর মায়ের কবরে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।