কবিতা

কুকুরটি বেঁচে নেই

আমি তাকে বাগানের মাঝামাঝি কবর দিয়েছি
এখন আমাকে ভীষণ শক্তিহীন মনে হচ্ছে।
তার সাথে বহুদিন সঠিক পথেই হেঁটে গেছি
ঢেউখেলা চুলে যে হাঁটবে না আমার সাথে কোনদিন।
আমি বাস্তবাদী, আকাশের শূন্যতাকে বিশ্বাস করি না
জানি আমাদের মতো কারো জন্য কোন স্বর্গ নেই
তবে কুকুরটি স্বর্গবাসি হলে আমিই সুখি হবো বেশি
এবং জানি সে আমার জন্য সেখানে অপেক্ষা করবে
প্রভূত্ব দেখাবে লেজ নেড়ে একমাত্র বন্ধুর জন্য।
কুকুরটি কখনো দাসত্ব করেনি, জামার ওপর হাঁটেনি
আয়ত্বে নেবার জন্য সে কখনও ছোঁয়ায়নি চুমু
অন্যদের মতো যৌনতায় মাতেনি সে
সে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতো বন্ধু হয়ে
যতোটুকু প্রয়োজন, যতোটুকু দরকার
সে আমাকে বুঝতে চাইতো মানুষের প্রয়োজনে
মানুষ পারে না অথচ কুকুরটি পেরেছিল নষ্টপ্রহরে।
স্বপ্নের চেয়েও শুদ্ধ মনে হতো তার দু’চোখ
মিষ্টি এবং পশমি গন্ধময় সুন্দর দিনে
কাছাকাছি প্রশ্নহীন, আমি তার লেজ ছুঁয়ে-
সাগর সৈকতে হেঁটেছি বহুদিন
শীতে যেখানে পাখিরা নির্জন আকাশ ভরে রাখে
সেখানে আমার পশমি কুকুর সাগরে ঢেউয়ে লাফাতো
আশ্চর্য কুকুর মুহুর্তেই তার সোনারং লেজ নিয়ে
আবার দাঁড়াতো সাগরের সব জল নাড়তে।
আনন্দ! কি যে আনন্দ তার!
আমার কুকুর জেনেছিল সুখী হতে হয় কোন পথে
মানুষের লজ্জাহীন দৌরাত্বের শাসন উপেক্ষা করে।
সেই কুকুরের জন্য আজ কোন শোকবার্তা নেই
সে এখন বহুদুরে, আমি তাকে মাটি চাপা দিয়েছি
অথচ তার ভালোবাসা মাটি থেকে বের হয়ে আসছে
যা বহনের ক্ষমতা আজ আমারও নেই।

পাবলো নেরুদা
পাবলো নেরুদা
পাবলো নেরুদা (১২ জুলাই, ১৯০৪ – ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩) ছিলেন চিলিয়ান কবি ও রাজনীতিবিদ। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নেফতালি রিকার্দো রেয়েস বাসোয়ালতো। পাবলো নেরুদা প্রথমে তাঁর ছদ্মনাম হলেও পরে নামটি আইনি বৈধতা পায়। কৈশোরে তিনি এই ছদ্মনামটি গ্রহণ করেন। ছদ্মনাম গ্রহণের পশ্চাতে দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, ছদ্মনাম গ্রহণ ছিল সে যুগের জনপ্রিয় রীতি; দ্বিতীয়ত, এই নামের আড়ালে তিনি তাঁর কবিতাগুলি নিজের পিতার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতেন। তাঁর পিতা ছিলেন কঠোর মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি। তিনি চাইতেন তাঁর পুত্র কোনো "ব্যবহারিক" পেশা গ্রহণ করুক। নেরুদা নামটির উৎস চেক লেখক জান নেরুদা এবং পাবলো নামটির সম্ভাব্য উৎস হলেন পল ভারলেইন। পাবলো নেরুদাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী লেখক মনে করা হয়। তাঁর রচনা অনূদিত হয়েছে একাধিক ভাষায়। নেরুদার সাহিত্যকর্মে বিভিন্ন প্রকাশ শৈলী ও ধারার সমাবেশ ঘটেছে। একদিকে তিনি যেমন লিখেছেন টোয়েন্টি পোয়েমস অফ লাভ অ্যান্ড আ সং অফ ডেসপায়ার-এর মতো কামোদ্দীপনামূলক কবিতা সংকলন, তেমনই রচনা করেছেন পরাবাস্তববাদী কবিতা, ঐতিহাসিক মহাকাব্য, এমনকি প্রকাশ্য রাজনৈতিক ইস্তাহারও। ১৯৭১ সালে নেরুদাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁকে এই পুরস্কার প্রদান নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কলম্বিয়ান ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস একদা নেরুদাকে "বিংশ শতাব্দীর সকল ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি" বলে বর্ণনা করেন।[১] ১৯৪৫ সালের ১৫ জুলাই, ব্রাজিলের সাও পাওলোর পাকিম্বু স্টেডিয়ামে কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা লুইস কার্লোস প্রেস্টেসের সম্মানে ১০০,০০০ লোকের সামনে ভাষণ দেন নেরুদা।[২] নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করার পর চিলিতে ফিরলে সালভাদর আলেন্দে এস্ত্যাদিও ন্যাশোনালে ৭০,০০০ লোকের সামনে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান।[৩] জীবদ্দশায় নেরুদা একাধিক কূটনৈতিক পদে বৃত হয়েছিলেন। একসময় তিনি চিলিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির সেনেটর হিসেবেও কার্যভার সামলেছেন। কনজারভেটিভ চিলিয়ান রাষ্ট্রপতি গঞ্জালেস ভিদেলা চিলি থেকে কমিউনিজমকে উচ্ছেদ করার পর নেরুদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে চিলির বন্দর ভালপারাইসোর একটি বাড়ির বেসমেন্টে কয়েক মাসের জন্য লুকিয়ে রাখেন। পরে গ্রেফতারি এড়িয়ে মাইহু হ্রদের পার্বত্য গিরিপথ ধরে তিনি পালিয়ে যান আর্জেন্টিনায়। কয়েক বছর পরে নেরুদা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রপতি সালভাদর আলেন্দের এক ঘনিষ্ট সহকারীতে পরিণত হন। চিলিতে অগাস্তো পিনোচেটের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থানের সময়েই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন নেরুদা। তিন দিন পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। জীবন্ত কিংবদন্তি নেরুদার মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই সারা বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পিনোচেট নেরুদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে জনসমক্ষে অনুষ্ঠিত করার অনুমতি দেননি। যদিও হাজারে হাজারে শোকাহত চিলিয়ান সেদিন কার্ফ্যু ভেঙে পথে ভিড় জমান। পাবলো নেরুদার অন্ত্যেষ্টি পরিণত হয় চিলির সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম গণপ্রতিবাদে।