গল্প

আজাহারকে ছুঁয়ে গেল

image_1154_287423_gifনাস্তার টেবিলের কাছে এসে আজাহার থমকে দাঁড়ায়। তার রোজকার নাস্তা সাধারণত রুটি, হাতে বানানো, সঙ্গে সবজি বা ঘন ডাল। আজ রুটি আর সবজি ভাজি আছে, তার পাশে সাজানো একটা ডিম, সেদ্ধ, একটা চমচম, এক গ্গ্নাস দুধ। এর মানে কী, সে বোঝার চেষ্টা করল। সে না বসে দাঁড়িয়ে থাকল, তাকিয়ে থাকল চমচম, দুধ আর ডিমের দিকে। রান্নাঘর থেকে শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে নাজমুন এলো, চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল_ সমস্যা কী! দাঁড়ায় আছ ক্যান?
আজাহারের মনে হলো এই প্রশ্নটা আসলে তারই করা উচিত ছিল_ সমস্যা কী?
নাজমুন বলল_ ভোঁতা মুখ কইরা দাঁড়ায়া আছ ক্যান! বসো।
আজাহার জিজ্ঞেস করল_ এইগুলা কী?
কোনগুলা?
আজাহার আঙুল তুলে দেখাল_ এই যে এইগুলা।
এইগুলারে নাস্তা বলে। বসো। অফিসে দেরি হইলে ধমক খাইবা।
আমি মিষ্টি খাই? আজাহার জিজ্ঞেস করল।
নাজমুন খেতে শুরু করেছে। সে উত্তর দিল না।
আমার না ডায়াবেটিস?
হ্যাঁ, তোমার বহুমূত্র। কিন্তু তোমার মিষ্টি খাওয়া দরকার। মিষ্টি খাইলে এনার্জি বাড়ে।
তারপর আবার ডিম দিছ দুধ দিছ।
দিছি। ভাবো একবার_ এইসব না খাইলে তোমার চলে! এখন থেইকা রোজ দিব।
কী বলতে চাও স্পষ্ট কইরা বলো।
কী বলতে চাই, সেইটা তুমি বুঝছ। বুঝো নাই?
আজাহারের ইচ্ছা করল হাতের এক ঝাঁপটায় সে টেবিলের ওপর রাখা সবকিছু উড়িয়ে দেবে। কিন্তু অতটা করার ইচ্ছা চাপা দিয়ে সে কঠিন চোখে নাজমুনের দিকে তাকাল। নাজমুন বলল_ ঐভাবে তাকায়া আছ ক্যান! যেদিন পারবা সেইদিন ঐভাবে তাকাবা। তার আগে না।
সমস্যার শুরু প্রায় বছর দুয়েক আগে। শুরুটা প্রায় হঠাৎ করেই। আজাহার যেন হঠাৎ করেই টের পেল, সময়মতো শরীর যতটা জেগে ওঠা দরকার, শরীর ততটা জাগছে না। সে ভাবল, সাময়িক; দেখল_ সাময়িক না, প্রায়ই এ রকম হচ্ছে। নাজমুন প্রথম প্রথম কিছু বলেনি, সে অবশ্য মিলিত হওয়ার হার আগেই কমিয়ে দিয়েছিল, সে নাকি ক্লান্ত বোধ করে, তার ইচ্ছাও করে না। আজাহার তখন প্রায়ই বলত_ ড্রামের মতো একটা শরীর বানাইলে ইচ্ছা আর থাকব ক্যান। কিন্তু তারপর সে নিজেই বিপদে, হয় সে জেগে উঠছে না, জেগে উঠলেও মেয়াদ মুহূর্তেই উত্তীর্ণ; যে নাজমুন ইচ্ছুক ছিল না, আজাহারের চেষ্টাগুলো ফিরিয়ে দিত, সে এক ছুটির দুপুরে বলল_ ব্যাংকে একটা শর্ট টার্ম ডিপোজিট ব্যবস্থা আছে না? তোমার অবস্থা হইছে সেই শর্ট টার্ম ডিপোজিটের মতো।
শুনে আজাহার গম্ভীর গলায় বলল_ এইটা তো তোমার জন্য হইছে।
আমি আবার কী করলাম!
তুমি আমারে একবার ‘না না’ বলছ, সেই ‘না না’ শুনতে শুনতে…।
আচ্ছা! অজুহাত দেখি ভালোই বাইর করছ!
এইটা অজুহাত না।
আচ্ছা, আগে না না করতাম, এখন হ্যাঁ হ্যাঁ করতেছি। দোকান খুইলা বইসা আছি, দেখি কেমন সওদা করো…।
শুনো, এইটা সাইকোলজি। এইটা তুমি বুঝবা না।
তাইলে আমি যেইটা বুঝব, সেইটা বলো।
শরীর বানাইছ ড্রামের মতন, পইড়া থাকো তক্তার মতন… আমি ঐ সময় বুঝি না তক্তা না মানুষ…।
বাজে কথা বলবা না আজাহার। তুমি ডাক্তারের কাছে যাও।
আজাহার ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার বলল_ করেন সাংবাদিকতা, সাংবাদিকরা নিয়ম মানে না। আপনিও মানেন নাই।
আজাহার বলল_ জি।
নিয়ম মানতে হবে। বয়স হয়েছে, এ বয়সে ওটা একটু কমে যাবেই। তারপর ডায়াবেটিস রেখেছেন হাই। কমান। দু’বেলা হাঁটুন। এসবই আগেও বলেছি আপনাকে।
কোনো ফুড সাপ্লিমেন্ট?
খুব চল হয়েছে এখন। কী দরকার? আপনি নিয়মমাফিক চলে দেখুন না…।
অনেকে ভায়াগ্রার কথা বলে…।
বলুক।
আপনি কী বলেন?
ভায়াগ্রা অনেকেই ইউজ করে। তবে হার্টের জোর থাকতে হয়। ইটিটি করে দেখুন একবার আপনার হার্টের জোর কেমন? রক্ত চলাচল ঠিক আছে কি-না? … বাদ দিন। নিয়ম মানুন। এটাই বড় কথা। আপনি সামনের একটা মাস পুরো নিয়ম করে চলুন। শরীর ভালো হবে, আর ঐ ক্ষেত্রে কিছু উন্নতি পাবেনই।
আজাহার মনে মনে বলল_ কিছু! একমাস পর কিছু! নাজমুন এই এক মাসে কত কথা তাকে তা হলে শোনাবে! নাকি এই এক মাস নাজমুনের দিকে হাত সে বাড়াবেই না! আচ্ছা, ঠিক আছে, একটা পরীক্ষাই না হয় দিল সে, হাত বাড়াল না, কিন্তু নাজমুন যদি হঠাৎ বাড়ায়! তার চেয়ে এটাই কি বেশি ভালো হতো না_ ডাক্তার যদি মাসে তাকে গোটা তিনেক ভায়াগ্রা এস্তেমাল করার অনুমতি দিত।
ভায়াগ্রা ও এস্তেমাল, দুটোই সে শুনেছে জামানের কাছ থেকে। এমন না জামানের মুখ থেকে শোনার আগেও শব্দ দুটো সে শোনেনি, তবে জামানের বলার ধরনটা অন্যরকম। জামান তার সহকর্মী। একবার, নতুন যোগ দেওয়া ছিপছিপে এক তরুণী সহকর্মীকে দেখে জামান বলল তোমরা যতই যা বলো, একে ভায়াগ্রা ছাড়া এস্তেমাল করা সম্ভব না। একে এস্তেমাল করতে হলে আগে ভায়াগ্রা এস্তেমাল করতে হবে।
জামানের এভাবে বলা স্বভাব। হয়তো দেখা যাবে ঐ তরুণীর সঙ্গে একটা কথাও সে বলবে না, তবে। ঐ তরুণী বা অন্য কাউকে নিয়ে রসালো কথাগুলো সে নিজেদের ভেতর বলবে। আজাহার কিছুদিন আগে কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করেছিল_ ঐ মিয়া, তুমি কি সত্যই এইসব নিয়া থাকো?
জামান নিরীহ মানুষের মতো মুখ করে উল্টো জিজ্ঞেস করল_ কী নিয়া আজা ভাই?
এই যে মুখে যা আসে তা-ই কও, ফটফট…।
আজা ভাই, আমার অবস্থা হইছে বুইড়া মানুষের মতন।
সেইটা কী রকম?
আসল জোর যত কমে, মুখের জোর তত বাড়ে।
আমারও শুধু মুখেই জোর। এই যে ভায়াগ্রার কতা সেইদিন বললা…।
আপনার লাগবে?
ধ্যাৎ মিয়া, কী যে কও না!
ব্যাপারটা ‘ধ্যাৎ মিয়া, কী যে কও না’ হয়ে ঝুলে আছে। আজাহারের মাঝে মাঝে মনে হয় এভাবে এটাকে ঝুলিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। জামান ছেলেটা ফুর্তিবাজ ও দিলখোলা। তাকে বলাই যায় ভায়াগ্রার কথা, বয়স হলে এ রকম হতেই পারে, আর ওদিকে জামান যতই ফুর্তিবাজ হোক, অন্য কাউকে বলে দেবে না। সুতরাং জামানকে ধরে ব্যবস্থা সে করতেই পারে। দাম নাকি একটু বেশিই, সে শুনেছে। তা, হোক দাম বেশি, দামের কথা সবসময় ভাবলে চলে না। শখ আর প্রয়োজনের কথাও ভাবতে হয়। দামের কথা তাই সে ভাববে না, সে জামানকে বলে জোগাড় করবে। জামানকে জিজ্ঞেস করে খাওয়ার নিয়মটা মেনে নেবে। ডাক্তার অবশ্য ইটিটি করে নেওয়ার কথা বলেছে। বললেই হলো, ডাক্তাররা এ রকম কথা অনেক বলে, এই যে হাজার হাজার, লাখ লাখ লোক খাচ্ছে, সবাই ইটিটি করে নিয়েছে? সেও করবে না, তবে নাজমুনকে সে অবাক করে দেবে_ পারি না বলে! দেখো।
খবরটা এলো সকালে রোজকার মিটিংয়ের মধ্যে। আজ মিটিং দুটো। সম্পাদকের সঙ্গে একটা, শেষ হলে বার্তা সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদকের সঙ্গে। আজাহারের এসব মিটিং অসহ্য লাগে। তার মনে হয়, কাজের কাজ কিছুই হয় না, শুধুই বকবকানি। তার কাজটাও কিছুটা ভিন্ন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুষ্ঠান থাকলে, থাকে রোজই, সে কভার করে। এই কাজের জন্য সময় ধরে মিটিংয়ে থাকার প্রয়োজন পড়ে না।
এই মিটিংয়ের শেষ দিকে, তারা যখন চা খাচ্ছে, তখন রেপকেসের খবরটা এলো। বয়স্ক একজন রেপ করেছে এক কিশোরীকে। একই এলাকায় বাসা, যাওয়া আসার পথে দেখা, লোকটার স্ত্রীর সঙ্গেও কিশোরীর ভালো পরিচয়, এসব মিলিয়ে মেয়েটা প্রায়ই আসত, মাঝে মাঝে স্কুলের পড়াও নাকি দেখিয়ে নিত। গত বিকালেও এসেছিল, মেয়েটার জানা ছিল না লোকটার স্ত্রীর বাসায় নেই, কিংবা সম্পর্ক এমন জানা থাকলেও মেয়েটা হয়তো আসত, এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে লোকটা। মেয়েটাকে একা পেয়ে মুখ বেঁধে রেপ করেছে, ভিডিওও করে রেখেছে।
এ দেখি রেপের মহামারী লেগেছে। সম্পাদক বললেন। বাচ্চু শোনো, বড় করে একটা নিউজ করাও। আগের রেফারেন্স দাও, সামাজিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা বলো…।
জি। দুটো নিউজ। একটায় পরিসংখ্যান ও মূল্যবোধ। আরেকটায় শুধু এই রেপকেসটা। এটার সঙ্গে আর কিছু যোগ করলে লোকজন পড়তে চাইবে না।
হ্যাঁ, দুটোই। এখনই কাউকে স্পটে পাঠাও। … সমাজের কী যে অবক্ষয় …।
বাচ্চু বলল_ মিজান ভাই আমি দেখতেছি।
ভিউজ তো ওভার টেলিফোন করতে পারবে। স্পটে কে যাবে?
কাউসার হাত তুলল। সে যেতে আগ্রহী।
বাচ্চু বলল_ স্পটে আজাহার ভাইরে পাঠাব।
শুনে সবাই অবাক হলো। সম্পাদকও_ আজাহার!… আজাহার, আপনি পারবেন?
আজাহার বলল_ মিজান ভাই, বাচ্চু ইয়ার্কি মারতেসে, আমি কি এইসব করসি কোনো দিন?
এইবার করবেন। বাচ্চু বলল। বলে বাচ্চু সম্পাদকের দিকে তাকাল_ মিজান ভাই, এ ধরনের রিপোর্ট এখানে করে তপন, কাউসার আর রাহাত। কিন্তু আপনি নিশ্চয় খেয়াল করছেন ওদের রিপোর্ট একই ধরনের হয়ে গেছে। কোনো ভ্যারিয়েশন নাই, আলাদা ফ্লেভার নাই।… আজাহার ভাই পারবেন। আমি উনারে ব্রিফ কইরা দিব।
আজাহার খুবই মেজাজ দেখাল বাচ্চুর ওপর_ তুমি এমন একটা কাজ করতে পারলা! তুমি আমার শত্রু, না আমি তোমার শত্রু যে এইটা করলা!
বাচ্চু বলল_ আসেন, চা খেতে খেতে কথা বলি।
হ। তোমার চায়ের আমি গুষ্টি কিলাই।
পত্রিকায় রেপকেস পড়েন নাই। চা খেতে খেতে বাচ্চু জিজ্ঞেস করল।
সেইটা তো পড়ছি?
রিপোর্টে কী কী থাকে, এইটা তো জানেনই।
হুঁ।
ব্যস। হয়ে গেল। তবে রিপোর্ট আপনি যখন করবেন, আপনি সিনিয়র রিপোর্টার, মূলত কালচারাল রিপোর্টার, দেখবেন আর সবার রিপোর্টে যা যা থাকছে, তার বাইরে আপনি নতুন কী যোগ করতে পারছেন।
ঘটনা এক রকম, একটাই, আমি নতুন কিছু কই পাব?
পাবেন। অন্তত আপনার লেখার স্টাইল, ল্যাঙ্গুয়েজ এসব তো আলাদা। এখন যান আজাহার ভাই, আমার সম্মান রাইখেন।
শুনো, তোমার সম্মানেরও গুষ্টি কিলাই।
আজাহার ঘটনাস্থলের ঠিকানা পেয়ে অবাক হলো_ আরে, এইটা দেখি আমার এলাকায়। আমাদের রাস্তা ৭ নাম্বার, এইটা হইল ১১। পাঁচ মিনিটের রাস্তা।
হয়তো দেখা গেল ঐ লোককে আপনি চিনেন।
মজা নাও?
আপনিই না বললেন কাছাকাছি বাড়ি। দেইখেন, প্রতিবেশী বলে ঐ লোকের ফেভারে রিপোর্ট করবেন না।
আজা ভাই, এই ফাজিলের কথা কানে নিয়েন না। আপনে যান, ঐ মেয়েটাও তো আপনার প্রতিবেশী, তাই না? পারলে ছবি আইনেন। আমরা ছাপলাম না, দেখলাম।

নাজমুন অবাক গলায় বলল_ এইটা তুমি কী বলো!
আমারে দেখতেছ না? ঘটনা সত্য।
ঘটনা সত্য হইলে তোমারে পাঠাইছে ক্যান! এইটা তো গান বাজনার ঘটনা না।
আমি এইটাও পারি। অফিস জানে। আমি লিখলে সবার চেয়ে ভালো লিখব, তাই পাঠাইছে।
ও! আচ্ছা, লিখো। বাতাস দিব?
ঘটনাস্থল থেকে অফিসে না গিয়ে বাসায় গেছে আজাহার। সে বাচ্চুকে ফোনে জানিয়েছে, বাসায় বসে রিপোর্ট তৈরি করে বিকেলেই বাচ্চুকে পেঁৗছে দেবে। তার ধারণা রিপোর্ট ভালোই হবে। বাচ্চু যেন চিন্তা না করে।
সে গোসল সেরে নিল। বেরিয়ে দেখল নাজমুন টেবিলও সাজিয়েছে। বলল_ এখান থেকে কত দূর ঐ লোকের বাড়ি।
আজাহার জানাল।
তুমি ঐ লোকরে দেখছ?
দেখছি। থানায় গেছিলাম।
বিচার হইব?
সেইটা তো ধরো অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করতেছে।
মেয়েটার বয়স কত বললা, ১৬?
সেইটা ধরো অনুমান। পুলিশ বলছে, থানার খাতায় মেয়ের বাড়ি থেকে তাই লিখছে। কিন্তু সেইটা ব্যাপার না। বয়স ১৬ না হইয়া ১৯ হইলেই বা-কী?
কিছু না। … মেয়েরে দেখছ?
না। বুঝো না। তারে আড়াল রাখা হইছে। তবে এলাকাবাসী বলতেছে মেয়ে নাকি খুবই সুন্দর আর ভদ্র। সে কি আর বুঝছে কী সর্বনাশ ঐ বাড়িতে অপেক্ষা করতেছে।
এই লোকের শাস্তি হওয়া দরকার। মানে ফসকায়া যেন না যায়।
হইব। পুলিশ আর মিডিয়া সিরিয়াসলি নিছে।
কী করা দরকার, জানো? জেল দিয়া কী হইব! হারামজাদা নিজের জিনিস সামলাইতে পারে না। জিনিসের তেজ বেশি। আস্তা ইটের ওপর ওর জিনিস রাইখা আরেক ইটা দিয়া ছ্যাঁচা দেওয়া দরকার। পারলে এইটা লিইখো।
আজাহারের রিপোর্ট সাড়া ফেলল। সম্পাদককে অবশ্য ততটা খুশি দেখা গেল না_ আজাহার সাহেব একটু বেশি নাটকীয় করে ফেলেছেন, না! মনে হচ্ছে উনি নিজেই ইনভলভড হয়ে গেছেন। বাচ্চু অবশ্য সম্পাদকের সঙ্গে একমত নয়, সে বলল_ মিজান ভাই, আপনি এটাকে হিউম্যান স্টোরি হিসেবে দেখেন। দেখবেন রিপোর্ট হইছে আলাদা। সম্পাদকের তবু খুঁতখুঁতানি থেকে গেল, তবে বিভিন্ন জায়গা থেকে এত প্রশংসা এলো, সম্পাদক মেনে নিলেন একটা ভালো কাজ হয়েছে এবং বাচ্চুকে বললেন_ ফলোআপ তারেই দাও।
আজাহার যখন অফিস থেকে বের হবে, তাকে হাতের ইশারায় ডাকল জামান। জামান তাকে বলল_
আপনার সঙ্গে এক কাপ চা খাব বইলা ডাকলাম। কেন জানেন?
এস্তেমাল বিষয়ে কিছু বলবা?
আরে ধুর! আপনার রিপোর্ট ভালো হইছে।
আজাহার হাসল।
এই রিপোর্টের জন্য আপনেরে কিছু দেওয়া দরকার।
কী দিবা?
চা খেতে খেতে এক ফাঁকে জামান কাগজে মোড়ানো ছোট একটা পুঁটলি আজাহারের দিকে বাড়িয়ে দিল_ রাখেন।
কী?
আজা ভাই, রাখেন আগে।
আজাহার রাখল_ এখন বলো, কী?
ভায়াগ্রা।
ভায়াগ্রা!
দুইটা ট্যাবলেট আছে। আপনার জন্য আগেই জোগাড় করছি। কিন্তু দিতে গিয়া দেখলাম অস্বস্তি লাগে। আজ মনে হইল এই উপলক্ষে দেওয়া যায়।
আজাহারের মুখে নানা রকম হাসি মিশে আছে, সে বলল_ কিন্তু আমি কি চাইছি এই জিনিস!
চান নাই। মনে হইল, দিলাম।
আর আমার যে দরকার, কে বলল।
কেউ বলে নাই। আজা ভাই, শুনেন, দরকার ছাড়াও অনেকে এস্তেমাল করে। এস্তেমাল কইরা দেখে_ কেমন।
আজাহার হে হে করে হাসতে লাগল_ মিয়া, কী যে তুমি বলো।
দেখেন_ কাজের কি-না। যদি মনে করেন_ দরকার, দোকান আর কর্মচারীর নাম বইলা দেব। আপনি নিজেই জোগাড় করতে পারবেন।
বাড়ি ফিরে আজাহার নাজমুনকে ভায়াগ্রার কথা বলল না। সে অফিসে বাথরুমে গিয়ে কাগজের পুঁটলি খুলে ট্যাবলেট দুটো দেখেছে। তারপর আবার ভালো করে গুটিয়ে পকেটে পুরে বাসায় ফিরেছে। বাসায় ফিরে নিরাপদ জায়গায় গুঁজে রেখেছে। নাজমুনকে সে বলল না ভায়াগ্রার কথা। সে নাজমুনকে বলল_ ঝামেলায় পড়লাম।
কী ঝামেলা সেটা জিজ্ঞেস করল না নাজমুন, সে তাকাল।
ফলোআপের দায়িত্ব আমার ওপর পড়ল। এই যে রিপোর্ট করলাম না…।
তোমার রিপোর্ট ভালো হইছে।
সবাই বলতেছে। ঐ যে লিখছি, শুরুই করছি হিউম্যান টাচ দিয়া। কিশোরী সুলভ চপলতা তার দূর হয়নি, সে হয়তো মাত্রই মাঝে মাঝে আনমনা হতে শুরু করেছে, দূরে তাকিয়ে গুনগুন করে গান গাইতে তার ভালো লাগে, স্বপ্ন দেখে সে…।
ভালো লিখছ। এই প্রথম তোমার রিপোর্ট পইড়া মন খারাপ হইল।
আগে কি এমন রিপোর্ট আমারে করতে দিসে! দিলে দেখতে।
নাজমুন অন্যমনস্ক গলায় বলল_ মেয়েটার জন্য খুব মন খারাপ হইসে।
হুঁ। কী বয়স বলো, ১৬-১৭ নইলে ১৮। এইটা কোনো বয়স!
তুমি তো লিখস, মেয়েটা হয়তো পালাবার পথ খুঁজছিল, প্রাণপণে বাধা দিচ্ছিল, কিন্তু সে ঐ নির্বোধ পাষণ্ডকে বাধা দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছিল না।
বাহ্, মুখস্থ দেখি তোমার।
এই যে লিখস না, এইখানে আমার খুব খারাপ লাগছে, মেয়েটার জন্য কষ্ট হইছে।
সে বাধা দিতেছে, কিন্তু পারতেসে না।
আর ঐ হারামজাদার কথা ভাব যে ঐ কুকাম করছে! বাঞ্চোত দেখতেছে, বাচ্চা মেয়েটা ভয়ে কাঁপতেছে, কান্নাকাটিও নিশ্চয় করছে… ঐটা হারামি মানুষের জাত!
রেপ করতে অনেক শক্তি লাগে, না?
অনেক। আসলে মানুষ তখন নরম্যাল থাকে না।
হুঁ। হুঁ বলে নাজমুন অনেকটা সময় চুপ করে থাকল। তার পাশাপাশি আজাহারও।
আবার মুখ খুলল নাজমুনই_ ডাক্তারের কাছে গেসিলা?
ডাক্তার! না, সে এখনই রিপোর্ট দেয় নাই।
কিসের রিপোর্ট? টেস্ট করতে দিসিল।
রেপ কেস নাজমুন! ডাক্তার পরীক্ষা করব না?
আরে, তোমারে না আমি ডাক্তারের কাছে যাইতে বলছিলাম।
গেসলাম।
টেস্ট করতে দিসে?
কিসের টেস্ট! ডাক্তার বলসে_ নিয়ম মানলে এক মাসে সব ঠিক। শুধু রুটিন লাইফ। বলছে এইটা কোনো ব্যাপার না।
এইটা যে কোনো ব্যাপার না, ডাক্তার বুঝল? বুঝব তো আমি।
আজাহার চুপ করে থাকল।
এক মাসের পনের দিন বোধ হয় গেছে। দেখি।
দেখো।
কলা, ডিম, দুধ, চমচম বাড়ায়া দেব ভাবতেছি।
আজাহারের মুখে হাসি ফুটল, সে বলল_ তাই!
মজা পাইলা মনে হয়!
না, মজা কিসের!
হুঁ, মনে রাইখ। মজা না।
রাখি।
কেমন মনে রাখো, দেখব।
দেখবা।
নাজমুন পাশ ফিরে আজাহারের দিকে তাকাল_ ব্যাপার কী?
কিসের ব্যাপার কী?
গলায় দেখি বোল ফুটছে।
ফুটছে।
জোর এক সময় ওপরে উইঠা আসে। গলায়। যখন উপায় থাকে না।
দেইখ।
কবে।
সময় হউক।
নাজমুন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল_ হুহ।
আজাহার জবাব দিল না। সে মৃদু হাসি নিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকল।
পরপর দু’দিন দুটো ফলোআপ করল আজাহার। এ দুটো রিপোর্টও প্রশংসা পেল। নাজমুনও বলল_ তুমি যে এমন লিখতে পার, এইটা জানতাম না।
আজাহার বলল_ আমার লেখা পড়লে মেয়েটার কান্না টের পাওয়া যায় না?
যায়। আবার লোকটা যে পাগলা কুত্তার মতো এইটাও টের পাওয়া যায়।
হুঁ। সবদিক মাথায় রাখি। তবে একটা আফসোসও আছে। মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে পারলে দারুণ রিপোর্ট করতে পারতাম।
সে ক্যান কথা বলব! কেউ বলে?
গ্রামে হইলে বলত। এইখানে তো মেয়েটারে তার ফ্যামিলি এমন লুকান লুকাইছে…।
নাজমুন বলল_ হয়তো মেয়েটারে দেখছি আমরা।
আজাহার অবাক হলো_ কোথায়?
আমরা ১৩ নম্বর রোডে মাঝে মাঝে হাঁটতাম না। ঐ রাস্তা চওড়া। হয়তো রাস্তায় দেখছি মেয়েটারে। এখন তো আর মনে করতে পারব না।
আজাহার হাসল_ হয়তো ঐ লোকরেও দেখছি।
তুমি কিন্তু বাড়িটা আমারে চিনাও নাই।
চেষ্টা করছি। অনেক বাড়ি কেমনে চিনাব। যখন ঐ রাস্তায় হাঁটতাম, তখন কি আর জানতাম ঘটনা অপেক্ষা করতেছে!
আমাকে একদিন নিয়া যাবা?
কই?
ঐ বাড়িতে। দেখব।
কী দেখবা? তালা দেওয়া বাড়ি। ঐ লোকের স্ত্রীও লুকায়া আছে। লজ্জা। বুঝো না। তবু দেখব। ধরো, সবকিছু তো তোমার মুখে শুনি। বাড়িটা দেখলে মিলায়া নিতে পারতাম… ঘটনা এইখানে ঘটছে…।
আজাহার হাসতে আরম্ভ করল।
হাসো ক্যান!
তোমার ছেলেমানুষী দেখি।
আজাহার, আমারে রাগাইও না।
না না, নিয়া যাব।… নাজমুন, তুমি ঠিক বলছ, ঐ বাড়িতে গেলে ঐ ঘটনা মনে পড়ে।
বাচ্চু বলল_ আজাহার ভাই, আপনি ক’দিন ঐ ঘটনা থেকে দূরে থাকেন।
আজাহার খুব অবাক হয়ে গেল_ দূরে থাকব মানে!
আমার অবজারভেশন বলে, এই ঘটনা নিয়ে অনেকদিন লেখালেখি হবে।
আমার অসুবিধা নাই, আমি আছি। এইটা খুব টাচি ঘটনা। আমি আছি।
এখন এক্সক্লুসিভ কিছুই লেখা হচ্ছে না। তেমন কিছু লেখারও নাই। আছে?
তা নেই। কিন্তু লেখা তো বন্ধ হয় নাই।
যা লেখা হচ্ছে তা রেগুলার রিপোর্ট। আপনার রেগুলার রিপোর্ট করার কী দরকার?
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আজাহার বলল_ সেইটা তুমি ভালো বুঝবা। কিন্তু আমি কোনো অসুবিধা দেখতেছি না।
বাচ্চু চুপ করে থাকল।
ধরো, রেগুলার রিপোর্টই বলো, আমি অন্যরকম লিখতে পারব।
আপনাকে দেখি নেশায় পেয়েছে।
এইটা কী বললা! আমি পত্রিকার ভালোর জন্য বলি।
আজাহার ভাই, আমি ভাবব। ওকে?
আজাহার তবু বসেই থাকল। বাচ্চু কতক্ষণ কাজে ব্যস্ত থাকল। কিন্তু সামনে একজন বসে থাকলে অস্বস্তি, সে তাই মুখ তুলল_ কিছু বলবেন আজাহার ভাই?
তুমি আমার ব্যাপারটা কনসিডার করবা?
বাচ্চু হেসে ফেলল_ বললাম না, করব।
রিপোর্ট তো ভালো হয়েছে…।
বাচ্চু এবার বিরক্ত হলো_ আমি বলেছি খারাপ হয়েছে?
না না, তুমি বলো নাই। আমি বললাম আর কি?
করতেন কালচারাল রিপোর্ট। আমি আপনাকে রেপ কেস করতে পাঠালাম। আমিই পাঠালাম। নাকি?
তুমিই তো, তুমিই তো।
আপনার রিপোর্ট নাম করল।
কালচারাল রিপোর্ট করার কথা ভাবলে এখন আর মজা পাই না।
আপনার নাম ফেটেছে তো, আপনাকে নামের নেশায় পেয়েছে। যান এখন। আমি দেখব।
আজাহার আর বাচ্চুর সামনে বসে থাকার সাহস পেল না। সে উঠে এলো, তবে নিজের জায়গায় বসলও না। সে এক এক কলিগের কাছে গেল, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার একই কথা, সে সাহিত্য পাতার সম্পাদক মানব হাসানের রুমে গেল_ মানব, তুমি তো কবি, তুমি সাহিত্য বুঝো, তুমি আমারে একটা সত্যি কথা বলবা?
কবিতা লিখেছেন? কবিতা হয়েছে কি হয়নি, এটা বলতে হবে? আজাহার ভাই, কবিতা লেখা সহজ না। কিন্তু সবাই মনে করে সহজ।
আরে রাখো মিয়া, আমার কী আর কাম নাই কবিতা লিখব!
যারা পারে না, তারা এ ধরনের কথা বলে। আপনার ব্যাপারটা কী?
আমার রিপোর্ট পড়ছ, রেপ কেস নিয়া?
রেপ হচ্ছে অবদমিত মানুষের…
মানব, রেপের ব্যাখ্যা দরকার নাই। রিপোর্ট পড়ছ?
জি। আজাহার ভাই, আপনার রিপোর্ট আমাকে অভিভূত করেছে।
সত্য? মেয়েটার অসহায়ত্ব আর পুরুষটার তাণ্ডব, টের পাওয়া যায়।
পরিষ্কার। ভিজ্যুয়াল করা যায়।
তাই। আজাহার কৃতজ্ঞ চোখে মানবের দিকে তাকাল। তুমি আমার মনের কথাটা বলছ।
স্পটে যখন গেলাম, বুঝছ, ঐ ঘটনা আমারে ছুঁয়ে গেল।
আমার মনে হয় এ ধরনের রিপোর্ট এখন থেকে আপনারই করা উচিত। আর যারা করে, তাদেরটা ভালগার হয়ে যায়।
এইটা যদি শুধু বাচ্চু বুঝত।
বাচ্চু ভাই আবার কী করলেন? ওনার কিছু সমস্যা আছে। এই সমস্যার নাম…।
বাচ্চু বলছে এখন আর আমার এই রিপোর্টের ফলোআপ করার দরকার নাই। কেন দরকার নাই?
দরকার যে আছে এটা আপনি মিজান ভাইকে বলেন।
তুমি বলতেছ? … রাইট। তারেই বলব।
সম্পাদককে পেল না আজাহার। আজ বিকালে আসবে না। আজাহার ঠিক করল সেওও ছুটি নেবে। বাচ্চুর উদ্দেশে সে একটা দরখাস্ত লিখে পাঠাল, শরীরটা ভালো ঠেকছে না, তা ছাড়া অন্য কোনো অ্যাসাইনমেন্টও নেই, সে বাসায় বিশ্রাম নেবে।

মেজাজ কিছুটা গরম করেই বাড়ি ফিরল আজাহার। অফিস যে খামোখা তার সঙ্গে শয়তানী করছে, এটা সে নাজমুনকে বলবে।
নাজমুন অবশ্য গম্ভীর। প্রথমে খেয়াল করেনি আজাহার, খেয়াল যখন করল, বোঝার চেষ্টা করল নাজমুনের গম্ভীর হয়ে থাকার কারণ কী।
নাজমুন অবশ্য সময় নিল না। সে তার হাত মেলে ধরল আজাহারের সামনে_ এই দুইটা কী এমন জিনিস, লুকায়া রাখসো।
আজাহার ভাবল, ভায়াগ্রা দুটো আরও নিরাপদ জায়গায় লুকানো উচিত ছিল।
বলো। ধন্ধা মারছ ক্যান!
ভায়াগ্রা।
ভায়াগ্রা!
আজাহার চুপ করে থাকল।
সত্য বলতেছি। ভায়াগ্রা, নাকি অন্য কিছু? নেশা ধরছ?
না, ভায়াগ্রা।
নাজমুন মাথা ঝাঁকাল_ ভায়াগ্রা বুঝছি। তাই তো বলি গলার জোর বাড়ছে ক্যান! আজাহার, ভায়াগ্রা খায়া তুমি বাহাদুরি দেখাবা?
আজাহার চুপ করে থাকল।
ভায়াগ্রা হাতে পাইছ, তাতেই এত জোর! খাইলে না কী অবস্থা! শুনো, এই দুইটা আমার ব্যাগে থাকল।
হুঁ। … নাজমুন, মনটা ভালো না।
নাজমুন শোনার আগ্রহ দেখাল না।
আজাহার বলল_ বলব, তোমারে মন খারাপের কারণ পরে বলব।
এবারও নাজমুনের মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা গেল না।
বিকালে অফিস যাব না। বইলা আসছি। … বিকালে ঐ বাড়ি দেখতে যাবা?
নাজমুন বলল_ যাব।
নাজমুন অবাক গলায় বলল_ এই বাড়ি!
আজাহার মাথা ঝাঁকাল_ হুঁ, এইটাই।
আমি ভাবসিলাম…।
কী?
না, মানে আলাদা কিসু না। … ভেতরে যাইতে পারব?
আরে না। তালা দেওয়া।
দু’জন বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল। পেঁৗছাতে পেঁৗছাতে তাদের দেরিই হয়েছে। বিকাল ফুরিয়েছে প্রায়, একটু একটু করে আলো কমে যাচ্ছে।
নাজমুন বলল_ ভৌতিক বাড়ি।
ঠিক বলছ। ভূতের খপ্পরে পড়ছিল মেয়েটা।
আজাহার, মেয়েটার কথা মনে হইলে খারাপ লাগে। মনে হয় সে অসহায় কান্না কান্না চোখে লোকটার দিকে তাকায় আছে।
হুঁ। কিন্তু লোকটা কিছুই শুনতেছে না।
না। তার হুঁশ নাই।
হুঁশ নাই। … নাজমুন, একটা ব্যাপার ভাবো।
নাজমুন তাকাল আজাহারের দিকে।
এই যে সামনের বাড়িটা, এই বাড়ির ভেতর মেয়েটা হয়তো ছুটতেছে, পলাইতেছে, কিন্তু লোকটারে সে ঠেকাইতে পারতেছে না। প্রাণপণে বাঁধা দিতেছে, কিন্তু লোকটা তারে কাবু কইরা ফেলতেছে, শুধু কাবু কইরা ফেলতেছে। এই ঘটনা কারে ছুঁইব না বলো? আজাহার অপলক তাকিয়ে থাকল বাড়িটার দিকে।
বাড়ি ফিরে চায়ের আবদার করল আজাহার। অন্য সময় হলে নাজমুন স্পস্ট একটা না বলত। নাজমুন না বা হ্যাঁ, কিছুই বলল না। সে চা করে আনল। চায়ের কাপ নিতে নিতে আজাহার বলল_ বসো।
নাজমুন_ বসল তার কাছে।
অত দূরে বসলা ক্যান!
নাজমুন বলল_ ঢঙ কইরো না, তোমার কোলে বসব নাকি?
বসো। কোলে বসলে অসুবিধা কী!
এহে রে…।
নাজমুন কথা শেষ করতে পারল না। আজাহার তার আগেই চায়ের কাপ একপাশে নামিয়ে রেখে নাজমুনকে টেনে নিল। নাজমুন বলল_ আরে করো কী!
আজাহার বলল_ দেখো।
নাজমুন দেখল।
দেখাদেখি শেষ হলে দু’জন দু’পাশে সরে হাঁপাতে লাগল। হাঁপাতে হাঁপাতে নাজমুন বলল_ আজাহার, তুমি হইলা মিনমিনা শয়তান। আরেকটা ভায়াগ্রা লুকায়া রাখছিলা, না?
আরে না।
মিথ্যা বলবা না।
কসম।
তাইলে তুমি আমার ব্যাগ থেইকা নিসো। আজাহার, তুমি আমার ব্যাগে হাত দিসো!
নাজমুন উঠতে নিল, আজাহার তাকে থামাল_ তোমার ব্যাগে হাত দেই নাই।
তাইলে! ডাক্তারের এক মাসও তো হয় নাই। হইসে?
আজাহার দু’পাশে মাথা নাড়ল_ হয় নাই।
সওদাপাতি তো ভালোই করলা। ঘটনা কী!
আজাহার উঠে বসল। হাই তুলল, ছোট আড়মোড়া ভাঙল, নাজমুনের দিকে তাকাল_ তখন বলতেছিলাম না মন খারাপ… মন খারাপ, বুঝছ? বাচ্চু ঈর্ষা করতেছে, আমারে নাকি আর রেপ কেস রিপোর্ট করতে দিব না। ক্যান দিব না, কও? আমি রেপ কেসের রিপোর্ট করলে, তার কী সমস্যা! সে চিফ রিপোর্টার হইছে। একজন রিপোর্টারের কিসের সুবিধা তা সে দেখব না?

মঈনুল আহসান সাবের
মঈনুল আহসান সাবের
মঈনুল আহসান সাবের (জন্ম ২৬ মে ১৯৫৮) একজন বাংলাদেশী সাহিত্যিক। তাঁর পিতা কবি আহসান হাবীব। জন্মস্থান ঢাকা। শিক্ষা: মাধ্যমিক: ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা (১৯৭৩) উচ্চ মাধ্যমিক: ঢাকা কলেজ (১৯৭৫) স্নাতক সম্মান (সমাজবিজ্ঞান): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭৮) স্নাতকোত্তর (সমাজবিজ্ঞান): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭৯) পেশা: কার্যনির্বাহী সম্পাদক: সাপ্তাহিক ২০০০, লেখালেখি। পুরস্কার: বাপী শাহরিয়ার শিশুসাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১), ফিলিপস পুরস্কার, হুমায়ুন কাদির সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৬) প্রকাশিত গ্রন্থ: পরাস্ত সহিস (১৯৮২), অরক্ষিত জনপদ (১৯৮৩), স্বপ্নযাত্রা (১৯৮৪), আগমন সংবাদ (১৯৮৪), মামুলী ব্যাপার (১৯৮৪), চারদিক খোলা (১৯৮৫), একবার ফেরাও (১৯৮৫), আদমের জন্য অপেক্ষা (১৯৮৬), আগামী দিনের গল্প (১৯৮৭), পাথর সময় (১৯৮৯), এসব কিছুই না (১৯৮৯), লাল বাড়ির অদ্ভুত ভূত (১৯৮৯), ভিড়ের মানুষ (১৯৯০), এরকমই (১৯৯০), কেউ জানে না (১৯৯০), কোনো একদিন (১৯৯০), মানুষ যেখানে যায় না (১৯৯০), এক রাত (১৯৯০), চার তরুণ-তরুণী (১৯৯০), কয়েকজন অপরাধী (১৯৯০), পরাজয় (১৯৯০), লিলিপুটরা বড় হবে (১৯৯০), বাংলাদেশের ফুটবল তারকা (১৯৯০), সীমাবদ্ধ (১৯৯১), অচেনা জায়গায় (১৯৯১), কয়েকটি প্রেমপত্র (১৯৯১), সতের বছর পর (১৯৯১), এ এক জীবন (১৯৯১), অপরাজিতা (১৯৯১), ফেরা হয় না (১৯৯১), অগ্নিগিরি (১৯৯১), ধারাবাহিক কাহিনী (১৯৯২), অপেক্ষা (১৯৯২), কবেজ লেঠেল (১৯৯২), হারানো স্বপ্ন (১৯৯২), দুই বোন (১৯৯২), নীল খাম (১৯৯২), না (১৯৯২), সে তোমাকে পাবে না (১৯৯২), মুন্নী (১৯৯২), লজ্জা (১৯৯২), ভূতের থাকা না থাকা (১৯৯২), সুদূর (১৯৯৩), প্রেম ও প্রতিশোধ (১৯৯৩), স্বজন (১৯৯৩), তুমি আমাকে নিয়ে যাবে (১৯৯৩), মঈনুল আহসান সাবেরের প্রেমের গল্প (১৯৯৩), এক ঝলক আলো (১৯৯৪), দুপুর বেলা (১৯৯৫), মৌমাছি ও কাঠুরিয়া (১৯৯৬), তিন সাংবাদিক ভূত (১৯৯৭), মুক্তিযোগ্দধা আব্দুল মালেকের হাসি (১৯৯৭), সংসার যাপন (১৯৯৭), মৃদু নীল আলো (১৯৯৭), রেলস্টেশনে অজানা গল্প (১৯৯৮), জ্যোতির্ময়ী, তোমাকে বলি (১৯৯৮), যোগাযোগ (১৯৯৮), নির্বাচিত প্রেমের উপন্যাস (১৯৯৯), ঠাট্টা (১৯৯৯), অবসাদ ও আড়মোড়ার গল্প (১৯৯৯), ফিরে আসা (১৯৯৯), নির্বাচিত গল্প (১৯৯৯), ব্যক্তিগত (২০০০), বৃষ্টির দিন (২০০০), খুনের আগে ও পরে (২০০০), সবচেয়ে সুন্দর (২০০০), এটা আমার একার গল্প (২০০১), কেউ একত্রে অপেক্ষা করছে (২০০১), উপন্যাসসমগ্র (২০০১), কিশোর সমগ্র (২০০৩), ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ (২০০৩), আমাদের খনজনপুর (২০০৪), পরের ঘটনা (২০০৪), শরীরের গল্প (২০০৪), যে কেউ না, তার সঙ্গে (২০০৫), সুকুমারের লজ্জা (২০০৫), তিলকের গল্প (২০০৬), দূরের ঐ পাহাড়চূড়ায় (২০০৬), এই দেখা যায় বাংলাদেশ (২০০৬), ঋষি ও নারী (২০০৫)। লেখা নিয়ে নির্মিত নাটক: পাথর সময়, না প্রভৃতি নির্মিত চলচ্চিত্র: লিলিপুটেরা বড় হবে আমি ধর্মবিশ্বাসী নই। এটি আমার আত্মীয়স্বজন, কাছের বন্ধুবান্ধব জানেন। আর কেউ জানেন না। কারণ আমার কাছে এটা জানান দেওয়ার ব্যাপার না। আমি আস্তিক নাস্তিক এই ব্যাপারগুলো নিয়ে ব্যস্তও নই। কখনো মনে করি না, নাস্তিকতা "প্রগতিশীলতার " অংশ হিসাবে ঘোষণা দেওয়ার মতো কিছু। যারা ঘোষণা দিয়ে নাস্তিক, যুক্তি নিশ্চয়ই তাদেরও মজুদ আছে। আমি আস্তিক নাস্তিক, এরকম সরল বিভাজনের ভেতরেও নেই। ধর্মের বিশ্বাস বা দর্শনগত দিকটি আমার কাছে প্রয়োজনীয় নয়। অস্বীকার করি না, পাশাপাশি, ধর্মের যে আচারিক, সাংস্কৃতিক ও দাপ্তরিক দিক আছে, তা আমাকে কমবেশি মেনে চলতে হয়। ধর্ম নিয়ে বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলার জন্য, ধর্মের সমালোচনার জন্য, ধর্ম ও এর পয়গম্বরকে গালিগালাজ করার জন্য এবং মূলত ইসলাম ধর্মের বিনাশ বা ধংস চাওয়ার জন্য সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন খুন ও আক্রান্ত হয়েছেন। হ্যাঁ, আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই। পাশাপাশি কিছু প্রশ্ন আমি এড়িয়েও যেতে পারি না। আমরা আসলে কী চাই? ধর্ম বা ইসলামহীন সমাজ? মোহাম্মদকে বেজন্মা বলে গালি দিয়ে সেটি কায়েম সম্ভব? আবার আমরা শুধু গালিই দেব, কিন্তু চাপাতির সংখ্যা দিনদিন কেন এত বাড়ছে, এটা বোঝার চেষ্টা করব না, এটাই বা আমাদের কী দেবে? অনেককেই বলতে শুনি, সমালোচনার জবাব খুন হতে পারে না। আমি আরেকটু এগিয়ে বলি, যে গালি বিশ্বাসিদের বুক ভেদ করে দেবে, তার জবাবও খুন হতে পারে না। কিন্তু মুসলমানদের অবস্থাটা, বিশ্বজুড়ে, কখনো কি বোঝার চেষ্টা করব, আমরা? পৃথিবীর কোনো আদিবাসীও হয়তো এতটা অস্তিত্ব সংকটে নেই, যতটা আছে মুসলমানরা। পুঁজি চায় প্রতিপক্ষ। এ মুহূর্তে মুসলমান ছাড়া আর কে হতে পারে প্রতিপক্ষ! মনে রাখুন, এখানে ধর্মের কোনো ব্যাপার নেই, ব্যাপার যা আছে, তা পুঁজিবাজার নিশ্চিত করার ও বৃদ্ধির। মুসলমান ক্রমশ কোনঠাসা হচ্ছে, ক্রমশ উন্মত্ত হচ্ছে। আপনি এর কাছে যুক্তি আশা করছেন আপনার কোন বিবেচনায়? আমাদের এখানে যে ঘটনাগুলো ঘটছেে, আমরা বলে দিচ্ছি তারা মাদ্রাসার ছাত্র, বলে দিচ্ছি তারা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর, অনুন্নত, বর্বর। এসব বলার পর আপনি আবার আশা করছেন, এই বর্বর পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যে কোনো সমালোচনা সহজভাবে নেবে, চিন্তার খোরাক হিসাবে নেবে! পুঁজির বাইরে ঘটনা ঘটে না। আমাদের এখানেও ওরা টিকে থাকে পুঁজিবাজার সচল রাখার প্রয়োজনেই। ধর্ম বোঝার আর মুখ খোলার আগে, সম্ভব হলে, আরো কিছু প্রাসঙ্গিক ব্যাপার বুঝে নিন। লাভ আমার আপনার, সবার।