কবিতা

থানা গারদ থেকে

তুমি এখন ছাদের আলসেতে
হয়ত কাপড় মেলছো ,মাগো ।
আমাদের বাড়ীর সামনের কাঠাল গাছটার ভারী ভারী পাতাগুলোর বুকে
সুর্যের কিরণ হয়ত এখন ছক ছক করছে ।
আর একটু পরে হয়ত তুমি লাল পেড়ে সেই গরদের শাড়িটা পরে আহ্নিক সারতে বসবে
তোমার ভেজা
ভেজো এলো চুল গুলো থাকবে পিঠের উপর ছড়িয়ে
আর আমি অন্ধকারের চেয়েও কালো একটা পুলিশ ভ্যানের গহ্বরে বসে
জনা বিশেক রাইফেল ধারীর পাহারায় আর একটু পরে
থানা গারদের অন্ধকার থেকে
পৌছে যাব ছোটা বিচারালয়ের আঙ্গিনায় ।
সুন্দরবনের কোন এক গ্রাম থেকে,
গত পরশু সন্ধ্যায় ওরা আমাকে গ্রেফতার করেছে ।
থানা গারদের অহিংসার প্রেমে
ওরা উৎপাঠিত করেছে আমার দু হাতের প্রতিটি নখ
আঙ্গুলগুলোকে বিষাক্ত করেছে রাইফেলের খুদোয় তেথলে তেথলে
কেননা ,ওদের বিশ্বাস আমার হাত দুটো নাকি বোমা বানাতে ভীষন ওস্তাদ ছিল।
মাঝরাতে ,ঠিক মাঝরাতে যখন বাইরের পৃথিবীটা গভীর ঘুমে অচেতন
তখন ওরা আমার প্রায় অচেতন দেহটাকে বউ বাজারের মোড়ের দোকানে
শুন্যে ঝোলানো ছাল ছড়ানো পাঁঠার মত
ঝুলিয়ে দিয়েছিল গারদের কড়ি কাঠে
পৈশাচিক হিংসায় বিদ্বস্থ করেছিল আমার পায়ের হাড় গুলোকে
কেননা ওদের বিশ্বাস আমার পা দুটো নাকি খরগোসের ছেয়েও ক্ষীপ্র ছিল।
শেষ রাতে, শেষ রাতে ওরা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল
ডি আই বি র বড়বাবুর পাদমন্দিরে
চালতার মত মুখওয়ালা কুত কুথে চোখ এক অফিসার
বধিদ্রুম বৃক্ষথলে বুদ্বের মতন করুনার হাসি বিলিয়ে
প্রশংসা করেছিল আমার পারিবারিক আভিজাত্যের,শিক্ষা দীক্ষার, আর বংশ কৌলিন্যের ।
আমার মত বনেদী বংশের এই দেশদ্রোহী হওয়া নাকি একান্তই মর্মান্তিক ।
অতএব, সুতরাং আমার পবিত্র কর্তব্য ধীরে ধীরে বলে ফেলা
কোথায় আছে আমাদের কমরেডরা,কোথায় আছে আমাদের অস্ত্র ভান্ডার ।
অবশ্য ডি আই বি র বড় বাবুও চান দেশে বিপ্লব হোক
বিপ্লব না হলে দেশের কোন পরিবর্তন হওয়াটা যে অসম্ভব।
আর সেই বিপ্লব আসবে ঐ থানা বাবুদের হাত ধরে ,
ঘুষের টাকার মতই নিঃশব্দে।
এবং আমার মুখ থেকে কোন কথা আবিস্কার করতে না পেরে
বুদ্বদেব মুহুর্তেই হয়ে উঠলেন ,
গোপাল পাঁঠার দোকানের পাঁঠা কাটা ষন্ডা কসাইটার মত ।
আমার নাকে ছেদা দুটো তার আদরের রক্তে বুঝে গেল ,
ছোয়ালের ভেতর থেকে খসে গেল দুটো দাঁত
নিজের রক্তের স্বাধ জিভ দিয়ে ছেটে
আমি পেয়ে গালাম প্রতিরোধের উদ্দাম ইশারা।

জয়দেব বসু
জয়দেব বসু
১২ মে ১৯৬২ জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায়। তিনি ছিলেন বাবা-মার জ্যেষ্ঠ সন্তান। পিতা পরিতোষ বসু ছিলেন নড়াইল জেলার সিঙিয়া গ্রামের মানুষ। মাতা বেলা বসু টাঙ্গাইল জেলার সাজানপুর গ্রাম নিবাসী। জয়দেব শিক্ষালাভ করেন পাঠভবন (শান্তিনিকেতন), প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পেশা হিসেবে বেছে নেন অধ্যাপনা। ৫০ বছর বয়সে জয়দেব বসু হারিয়ে যাবেন কেউ ভাবেনি, কেউ কল্পনা করেনি। এ বয়সেও তিনি ছিলেন যেন তারুণ্যে উজ্জ্বল, রঙিন-আলোকময়। তাঁর শৈশব কাটে দার্জ্জিলিং এবং শান্তিনিকেতনে। স্কুল শেষ করে যোগ দেন কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে বাংলা নিয়ে। স্নাতকোত্তর পড়া শেষ করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এর পর তিনি দমদম মোতিঝিল কলেজে অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত দীর্ঘ কবিতা “মেঘদূত” যা প্রকাশিত হয়েছিল । ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১২ জয়দেব বসু মৃত্যু বরন করেন ।