রুম নাম্বার ২১৭

নিউ ইয়র্কে স্থায়ী হয়েছি।
জ্যামাইকায় বিশাল বাড়ি ভাড়া করেছি। দোতলা বাড়ি। বেসমেন্ট আছে, এটিক আছে। বাড়ির পেছনে বারবিকিউ করার জায়গা আছে। নানান আসবাবে বাড়ি সাজানো হয়েছে। শোবার ঘরে কিছু যন্ত্রপাতিও বসানো হয়েছে, এর মধ্যে একটির নাম ‘হিউমেডিফায়ার’। এই যন্ত্র থেকে সারাক্ষণ গোঁ গোঁ শব্দ হয়। আধো ঘুম আধো জাগরণে মনে হয় কাউকে যেন গলা টিপে মারা হচ্ছে। সে কাতরাচ্ছে মৃত্যুযন্ত্রণায়। যন্ত্র বন্ধ করতে পারি না। ডাক্তারের নির্দেশ, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ আমার শরীরের জন্য ভালো_এমন পর্যায়ে রাখতে হবে। আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি ভৌতিক শব্দের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে।
শাওন চেষ্টা করে যাচ্ছে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসার। তার ধারণা, যেই মুহূর্তে আমি কাগজ-কলম নিয়ে বসব সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আমার রোগের প্রকোপ কমতে শুরু করবে।
আমার মায়েরও দেখি একই ধারণা। তিনি শাওনকে টেলিফোন করে প্রথমেই বলেন, বৌমা! হুমায়ূন কি কাগজ-কলম
নিয়ে বসেছে?
শাওন হতাশ গলায় বলে, না।
তাঁর হাতের কাছে কাগজকলম আছে তো?
সব আছে। সে চেয়ার-টেবিলে বসে লিখতে পারে না, মাটিতে বসে লেখে। ওর লেখার জন্য টুল কিনেছি। টুলের সামনে নরম উলের শ্যাগ কার্পেট বিছিয়ে রেখেছি।
মা বললেন, চেষ্টা করে দেখো ওকে ভুলিয়েভালিয়ে লেখার টেবিলে বসাতে পারো কি না। একবার কলম হাতে নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাল্লাহ।
আমার সমস্যা হচ্ছে, কলমকে আমার বিষাক্ত মনে হচ্ছে। কিছুই লিখতে ইচ্ছা করছে না; বরং মনে হচ্ছে এক জীবনে অনেক লিখেছি, আর কত! প্রথম যৌবনে রাত জেগে পাতার পর পাতা লিখেছি। সন্ধ্যায় লেখার টেবিলে বসে ফজরের আজানের পর টেবিল ছেড়ে উঠেছি। এক রাতে উপন্যাস শেষ করেছি। উপন্যাসের নাম ‘অচিনপুর’। এখন বিশ্রাম।
শাওন আমার লেখার টুল ও শ্যাগ কার্পেট যেখানে বসিয়েছে, সেই জায়গাটাও আমার পছন্দ না। এখান থেকে জানালা দিয়ে প্রকাণ্ড একটা ম্যাপল ট্রি দেখা যায়। এই বৃক্ষের দিকে তাকালেই কেমন যেন লাগে। আসন্ন শীতের কারণে গাছ দ্রুত পত্রশূন্য হচ্ছে। আমি নিজের ছায়াই যেন ম্যাপল গাছে দেখতে পাচ্ছি।
এক সন্ধ্যায় ইচ্ছার বিরুদ্ধেই লেখার টেবিলে বসলাম। হাতে কলম তুলে নিলাম। সঙ্গে সঙ্গে শাওন আমার মাকে টেলিফোন করে গলা নামিয়ে উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলল, মা, সুসংবাদ আছে। ও লিখতে বসেছে!
মা কী বললেন শুনতে পেলাম না। নিশ্চয়ই দোয়া-দরুদ পাঠ করলেন।
আমি ঠিক করলাম ‘কর্কট সময়’ নাম দিয়ে ১৩টা গল্প লিখব। গল্পগুলো হবে বাস্তব এবং পরাবাস্তবের মাঝামাঝি সীমারেখায়। কর্কট আক্রান্ত মানুষ বাস্তব এবং পরাবাস্তবের সীমায় বাস করে। তার কাছে সবই বাস্তব এবং সবই অবাস্তব।
আমি কাগজে প্রথম গল্পের নাম লিখলাম, রুম নাম্বার ২১৭, এটা একটা হোটেলের রুম নাম্বার। হোটেলটা রাজশাহীতে। নাম ‘নিরিবিলি’।
এই হোটেলে এক রাতের জন্য থাকতে এসেছে গিয়াসুদ্দিন আখন্দ। তার বয়স তেত্রিশ। সে ঢাকার একটি কোচিং সেন্টারের অঙ্কের শিক্ষক। রাজশাহীতে এসেছে শাহ মখদুমের মাজার জিয়ারত করতে। অতিসম্প্রতি তার ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। চিকিৎসা শুরু করার সামর্থ্য নেই। ব্যাংকে তার জমা টাকার পরিমাণ সাঁইত্রিশ হাজার তিন শ। এই টাকায় আধ্যাত্মিক চিকিৎসা করা যায়। বাংলাদেশের মাজারে মাজারে ঘোরা যায়। কেমোথেরাপি বা রেডিও থেরাপিতে যাওয়া যায় না। ঢাকায় একেকটা কেমোর দাম ত্রিশ হাজার টাকা।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  আমার ভাঙা ঘরে

আমার সমস্যা হচ্ছে, রাজশাহী শহর চেনা নেই। ছোট হোটেলগুলো কোন রাস্তায় তাও জানি না। গল্প বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে প্রতিটি ডিটেল নিখুঁত দিতে হবে। অতি ক্ষমতাবান লেখকদের ব্যাপারে কোনো কিছুই খাটে না। তাঁরা যা করেন তাই মনে হয় যথার্থ। ‘আনা কারেনিনা’ নামের উপন্যাসে টলস্টয় তাঁর নায়িকাকে এনেছেন উনিশ নাম্বার চ্যাপ্টারে। এর আগ পর্যন্ত আমরা আনা কারেনিনার বিষয়ে কিছুই জানি ন

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

হুমায়ূন আহমেদ- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...