আমাদের যে গোঁড়ায়ই গলদ !!

fireঅনেক দিন থেকেই শুনছি মেয়েরা বুঝি ঘরের বাইরে নিরাপদ নয় !! তাই মনে হল কিছু বলি । বাইরে দেখার আগে আমরা যদি একবার নিজের ঘরের মেয়েদের দিকে একবার তাকাই তাহলে নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারব আমাদের চোখের সামনেই ( যুগ , বছর , মাস নয় মাত্র দিনে একটিবার খেয়াল করি যদি ) আমাদের ঘরের মেয়েদেরকে আমরা নিজেরাই কত অন্যায় অবিচারের দিকে ঠেলে দেই ! জন্ম থেকে শুরু করে শেষ অবধি আমরা আমদের ঘরেই কত সংঘর্ষের মুখোমুখি হই!!! ইংরাজিতে একটা কথা আছে না ” charity begins at home ” ! তাহলে কি আমরা পারি এই ছোট্ট পরিসরে আমাদের দৈনিক দায়িত্বটুকু সামলাতে ? একবার ভেবে দেখুন ! কেবল মোমবাতি নিয়ে বাইরে লোক না দেখিয়ে আমরা যদি মনের প্রদীপ টাকে আলো করে একবার চোখ খুলে নিজের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো কত ছোট অথচ ক্ষমার অযোগ্য অন্যায় আমরা নিজেরাই করে বেড়াচ্ছি !! তাহলে কি আমরা চুপ করে থাকবো ? না । নিজের ঘরের মেয়েদের চোখের জলটাকে মিটিয়ে আমরা যদি এগোই তাহলে আমাদের প্রতিবাদী সুরটা মনে হয় আর ও তীব্রতর হবে !! আমাদের যে গোঁড়ায়ই গলদ !! গাছের জড়ই যদি ঘুণে ধরা হয় তো উপরের ডালপালা সুন্দর করে কি হবে? বাঁচাতে পারবেন সেই গাছটা ? বোধহয় না !!

যারা এই অন্যায় করেছে তাদের এই ভুল শিক্ষার জড়টা কোথায় একবার তা ভেবে দেখা উচিত আমাদের। তারা কি কখনো তাদের স্কুল এ এই ধরণের কিছু অন্যায় করেনি ? ওই গোঁড়ায় গলদ গুলাকে তাদের অভিভাবকদের কাছে কখনো কি স্কুল থেকে ওদের শিক্ষকরা শুধরে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন? যদি ওদের পরিবার ওদের ওই ছোটবেলার দোষগুলা এড়িয়ে গিয়ে থাকেন তাহলে ওদের ওই ধরণের ব্যবহারের বিরুদ্ধে কি কোনও শিক্ষক প্রতিবাদ করেছিলেন ? আমরা কি তা জানি? কাপড়ের ফুটো যদি ছোট থাকতে না সারানো যায় তাহলে পুরো কাপড়টা ছিঁড়ে যাওয়ার পর তাতে তালি লাগিয়ে লাভ কি? গুয়াহাটিতে একটা মেয়ের সাথে মাঝ রাস্তায় এতো লোকের সামনে যা ঘটলো তাতে কি ওইসময় সেখানে উপস্থিত লোকেদের ও সমান দোষ ছিলোনা ? তারা যদি তখন একটা মেয়েকে ওই শয়তানগুলোর হাত থেকে তখনই উদ্ধার করতে না পারলেও পরে যে ওই মানুষগুলাই ওর ছবি হাতে রাস্তায় লোকদেখানো প্রতিবাদ জানায়নি তা কি আমরা বলতে পারবো? এই প্রতিবাদের কি মূল্য আছে ? দামিনীর আগেও ওর মতোই কত দামিনী নীরবে শেষ হয়ে গেছে শুধু ন্যায়ের আশায় ! মেয়েদের কি রাস্তাঘাটে ওদেরই পাড়ার ছেলেরা রোজ অপমানিত করছেনা ? ওদের স্কুলে কি ওদের কোনও সহপাঠী বাজে কথা বলে আজ ও অপমানিত করছেনা ? কয়টা স্কুল ওই নিচু মানসিকতার ছাত্রদের শুধরাবার চেষ্টা করে ? আর কয়জন অভিভাবক ওদের সন্তানদের ওই নিচু মানসিকতাকে জড় থেকে নষ্ট করে ওকে ‘ প্রকৃত মানুষ ‘ করে তুলতে দৃঢ়তার সঙ্গে চেষ্টা করেছেন ? তাহলে বলুন এসবের সৃষ্টি কোথায় ? ওই শয়তানগুলো যারা মেয়েদেরকে কেবল ধর্ষণ করার মতো ভোগ্য বস্তু মনে করে তাদের এই মনোবৃত্তি কি ওই মুহূর্তেই সৃষ্টি হয়েছিলো ? আগে কি ওদের পরিবারের কেউ ওদেরকে এভাবে চলাফেরা করতে দেখেনি ?

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  শিশুদের শেখানো

এরকম যে একটি ঘটনাই হয়েছে তা নয় । আজ ও আমাদের পাড়াতেও হয়তো চোখ খুলে দেখলে দেখতে পারবো এই ধরনের ঘৃণ্য মানসিকতার মানুষ ! একটা ঘৃণ্য ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমরা প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামি । আর বাকিটা সময় কি আমরা পারিনা নিজের হাতের নাগালের ভিতরে যেগুলো এই ধরনের ঘটনা ঘতে যাচ্ছে ওইটাকে তখনই নষ্ট করার ? এটাও তো দেশের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ! প্রতিবাদের এটাও আর একটা রূপ যা আমরা ইচ্ছা করলে আমাদের ঘর থেকেই শুরু করতে পারি ! তাতে আমরা একভাবে দেশেরই উপকারের একটা মাধ্যম হতে পারবো নিজ নিজ পথে !তাই না ? এরকম অনেক লোক রয়েছেন যারা হয়তো রাস্তায় এসে প্রতিবাদ জানাতে পারছেন না অনেক কারণে ! কিন্তু তাহলে কি হাতে হাত ধরে বসে থাকবেন ? পারবেন না ওরা ওদের চোখের সামনে ( হয়তো ওদের নিজেদের ঘরেই ) যেসব অন্যায় ঘটে যাচ্ছে সেগুলো ঠিক করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে একটা বিবেকসম্পন্ন পদক্ষেপ নিতে ? ঘরের বাইরে গিয়ে যেমন আমরা নীরবতা ভেঙে প্রতিবাদ জানাচ্ছি সেভাবে আমাদের ঘরেও তো আমরা ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি !! এইভাবে শুধু আমরা আমাদের ঘরের জন্য কেবল নয় দেশের জন্য ও অনেক অবদান রেখে যেতে পারি আমাদের দায়িত্বের এই ছোট্ট পরিসরেও ! এতে পুরো দেশ একসঙ্গে আমাদের হাতের মুঠোয় না আসুক প্রতিবাদের জন্য কিন্তু এই পথে চলে আমরাও তো পারি ছোট ছোট ক্ষেত্রেও আমাদের প্রতিবাদের সুরটাকে সজাগ করে তুলতে ! যেখান থেকে এইসব ঘৃণ্য মানসিকতার সৃষ্টি তার জড়টাকে নষ্ট করা একান্ত দরকার বলে আমার মনে হয় আর তা কেবল আইনের সাহায্যেই সম্ভব নয় । দরকার গোঁড়া থেকে মানুষের মনে মেয়েদের প্রতি সম্মানবোধ জাগিয়ে তোলা আর তা আমাদের নিজেদের ঘরের ভিতর থেকেই শুরু করা উচিত । ভুল- শুদ্ধের প্রথম শিক্ষা আমরা আমাদের জন্মদাতা মা বাবার কাছ থেকেই লাভ করে থাকি । তাই বলি গোঁড়াটা মজবুত হওয়া দরকার । নাহলে ভবিষ্যতে আর ও দামিনী সৃষ্টি হতে থাকবে আর আমরা অসহায় হয়েই দাড়িয়ে দেখতে থাকবো । তাই আমাদের সংবাদ মাধ্যমের আলোর পিছনেও একবার গিয়ে দেখা উচিত যেখানে প্রতিদিনই এরকম অনেক দামিনীরা অপমানিত হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ।

সম্পর্কিত পোষ্ট =>  অন্যরূপে সাম্প্রদায়িকতা

প্রত্যেক সময়ই ঝড় আসার আগে একটা পূর্বাভাস দিয়েই থাকে । দরকার ওই পূর্বাভাসটাকে বুঝে গোড়াতেই ওইটাকে নষ্ট করে দেওয়া যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মতে আর কোনও দামিনী না সৃষ্টি হয় । দরকার ঘরে ও বাইরে দুটো ক্ষেত্রেই নিজের আত্মাকে জাগিয়ে তোলে অন্যায়কে সহ্য না করে এগিয়ে যাওয়ার । নাহলে এই ধরনের কুকর্ম কখনই থামবে না !! প্রতিবাদ কেবল রাস্তায়ই নয় প্রয়োজন প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে তা জ্বলে উঠার যাতে মেয়েরা ঘরে ও বাইরে দুদিকেই সুরক্ষিত থাকতে পারে । একটা বাড়ি শক্ত করে বানাতে গেলে তার ভিতটা মজবুত হওয়া দরকার ! কিন্তু তা বলে কি ঘরের ছাদকে মজবুত করবো না ? নিশ্চয়ই করবো । তার জন্যই আইনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও দরকার একটা দিনের জন্য হলেও সমালোচনার মুখে ঠেলে দেওয়ার !!! একটিবার নিজের ঘরের মা, মেয়ে , স্ত্রী , বৌ কে জিজ্ঞেস করে দেখুন ওরা কি সত্যিই সত্যিকারের সম্মান লাভ করছে আপনার নিজেরই ঘরে ????? ভেবে দেখুন ।। নাহলে অনেক দেরি হয়ে যাবে হয়তো !! ২০১২ তে আমাদের বিশ্ব যখন ধ্বংস হয়ে যায়নি তাহলে আর একটি নুতন যুগের সৃষ্টির সাক্ষী হয়ে থাকি আমরা ! বা এভাবেও বলতে পারি একটা নুতন যুগ –একটা নুতন ভারতবর্ষই তাহলে সৃষ্টি করা যাক ।।

মন্তব্য

মন্তব্য সমুহ

অরুণিমা চক্রবর্তী- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
রেটিং করুনঃ
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

২ টি মন্তব্য

  1. আমাদের সমাজ ব্যবস্থাতে ছেলেবেলা থেকে ছেলে এবং মেয়ের বৈষম্য তৈরি করে দেয় । জাপানের স্কুলের প্রাথমিক স্থর থেকে ক্লাসের আসন ব্যবস্থাতে একজন ছেলের পাশে একজন মেয়ের আসন থাকে । এই আসন ব্যবস্থা ২ মাস পরপর পরিবর্তিত হয় । ২মাস পরপর পাশের ছাত্র বা ছাত্রের আসনে অন্য আরেক জন এ পরিবর্তিত হয় । এর ফলে একে অন্যের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য গড়ে উঠে।

  2. খুব সুন্দর বলেছেন । অনেক মেয়েই বাইরের জগতে ধাক্কা খায়না , কিন্তু দেখা যায় ঘরেই লাঞ্ছিত হয় বিভিন্ন জনের কাছেই । কেউ জানেনা সে কথা । এমন ভুরি ভুরি ঘটনা আমি শুনেছি । মেয়েরা লজ্জ্বায়-ভয়ে-সঙ্কোচে কাউকে বলতে পারেনা । অনেক নারীই মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে জীবন কাটাচ্ছে । আমাদের সমাজ-ব্যবস্থা এমন যে বাবা-মা কে নিজের ঘরের মানুষ সম্পর্কে বলতে যাওয়ায় খুবই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দুলতে থাকে মেয়েরা । এর ফলে জানা যায়না কতো জন মেয়ে ঘরের ভেতরে ধর্ষণের শিকার । বাবা-মায়েরা যদি সন্তানের সাথে বন্ধুদের মতো আচরণ করে তাহলেই ঘরের ভেতরের এই জঘণ্য ঘটনা হ্রাস পাবে । তবে আমি মনে করি প্রতিটি বাড়ীতে ছেলেদের ছোট থেকেই শিক্ষা দেয়া উচিত , নারীদেরকে সম্মান করার । আর এটাই একমাত্র পথ যা নারীকে নারী হিসেবে নয় মানুষ হিসেবে সমাজে তার পরিচয় পরিগণিত হবে । আমাদের ঘরই যদি অন্ধকার হয় , বাইরের আলোয় কি আঁধার কাটবে ?
    আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ অরুণিমা ।

Comments are closed.