গল্প

জল পড়ে পাতা নড়ে

Untitled-23আমার জন্ম হয়েছিল এক বর্ষণমুখর রাতে। সম্ভবত এ জন্যই বৃষ্টির শব্দ আমার অন্তরাত্মায় একটা ঝংকার তোলে। বৃষ্টির ধ্বনি-প্রতিধ্বনি আমাকে এখনো আকুল করে। আমি যদি কবি না হতাম, তাহলে সংগীতজ্ঞ হতাম—এটা আমার ধারণা; কল্পনাও বলা যায়। আমি অতি অল্পে তুষ্ট হই না। সর্বদা আমার মধ্যে খেলা করে ভাষার ব্যঞ্জনা, ব্যাকুলতা। একই সঙ্গে স্বপ্নের ভেতরে চলার উন্মাদনা। শৈশব-কৈশোর যাপন করেছি আমার নিজের শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তখন এই শহরে সংগীত সংসদ বলে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। সেখানে অন্যান্য তরুণের মতো আমারও গতায়াত ছিল। মনে পড়ে, বৃষ্টির শব্দ একদা আমার মনের গভীরে জলতরঙ্গের ধ্বনি তুলতে তুলতে মিলিয়ে যেত। আমি বৃষ্টি নিয়ে একাধিক কবিতা লিখেছি। সেসব এখন আর মনে নেই। তবু এখনো আমি বর্ষণের ঋতুকে, বর্ষার দিনগুলোকে আমার মনের ভেতরে ধরে রাখার চেষ্টা করি। ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’—এটা কেবল কথার কথা নয়, এ হলো একধরনের সুখানুভূতির কাব্যিক প্রকাশ। আমি বৃষ্টির শব্দে হূদয়ে একটি কাব্যময় অবস্থার কল্পনায় অতি সহজেই নিমজ্জিত হয়ে যাই। বর্ষা আমাকে কাঁপায়, ভাবায় এবং গৃহ ছেড়ে পথে নেমে বৃষ্টিতে ভেজার আমন্ত্রণ জানাতে থাকে। আমি ভিজতে ভালোবাসি। বৃষ্টির ফোঁটায় আমার পরিচ্ছদ যখন সিক্ত হয়ে জবজবে হয়ে যায়, নিজের রক্তে-রন্ধ্রে কান পেতে আমি শুনতে পাই, প্রবল বৃষ্টিতে যেন ভেসে যাচ্ছে সবকিছু। বর্ষায় আমি দেখেছি, স্রোতে ব্যাঙের পেছনে ঢোঁড়া সাপের গতি। সাপের শরীরের আঁকাবাঁকা স্রোত আমার চোখে দারুণ শিহরণ ও ঈষৎ আতঙ্কের সৃষ্টি করে। তবুও বাংলাদেশের এই বর্ষণ ঋতুর মাধুর্য আমি উপলব্ধি করি, শুষে নিতে চাই; এবং এ ঋতুতে প্রায়ই মূর্ছিত একটা অবস্থা আমার মধ্যে বিরাজ করতে থাকে। বৃষ্টির ফোঁটা গোলাপের বোঁটায় লাগলে গোলাপ তার কাঁটাকে অতিক্রম করে যেমন গোলাপি পাপড়ি মেলে দেয়, আমিও কাব্যরচনায় এই প্রাকৃতিক নিয়মকে অনুসরণ করার প্রয়াসী। আমি ছন্দ শিখেছি প্রকৃতির কাছে। প্রকৃতি যেভাবে লতায়-পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা ধারণ করে প্রায় মূর্ছাহত অবস্থায় দোল খেতে থাকে, আমি সেই দোলা আপন অন্তরে ধারণ করে কবিতায় ছন্দ-মিল-অনুপ্রাস সৃষ্টির কবিসুলভ কায়দা আয়ত্ত করেছি। আমার ধারণা, আমার জন্মই হয়েছে মিল সৃষ্টির অনুপ্রেরণায়। আমি মিল দিতে যেমন জানি, তেমনি, অমিলের গদ্যকাঠামো অতিক্রম করে গল্পের সারাৎসার নিংড়ে নিতেও অভ্যস্ত হয়েছি। যেন আমি জন্ম থেকেই জানতাম আমি কবি। তা ছাড়া সব সময় জোরের সঙ্গে এও বলে এসেছি যে কাব্য রচনা ছাড়া আমার আর কোনো গুণ নেই। কবির কাজ হলো—আমি বহুবার বলেছি, তাঁর জাতিকে স্বপ্ন দেখানো। বৃষ্টি, বর্ষা কবির ভেতরের সেই স্বপ্নকে, কল্পনাকে সত্যে রূপান্তরিত করে দিতে পারে। কবি, একমাত্র কবিরাই জানেন, শব্দের প্রকৃত অর্থ কী! ‘কবিরা ভাসেন কল্পনায়, তাঁরা তো সত্য বলেন না’—এ কথা অনেকেই বলে। কিন্তু কবিরা যে মিথ্যা বলেন—এই সাক্ষ্য কে দেবে? জগতে এমন একজনও নেই।—বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের মতো এই কথাটিই শেষ পর্যন্ত সত্য।

আল মাহমুদ
আল মাহমুদ
আল মাহমুদ বাংলা ভাষার প্রধানতম আধুনিক কবিদের একজন। ১৯৩০-এর কবিদের হাতে বাংলা কবিতায় যে আধুনিকতার ঊণ্মেষ, তার সাফল্যের ঝাণ্ডা আল মাহমুদ বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে অদ্যাবধি তুলনারহিত কৃতিত্বের সঙ্গে বহন ক'রে চলেছেন। রবীন্দ্র-বিরোধী তিরিশের কবিরা বাংলা কবিতার মাস্তুল পশ্চিমের দিকে ঘুরিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন;– আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতাকে বাংলার ঐতিহ্যে প্রোথিত করেছেন মৌলিক কাব্যভাষার সহযোগে– তাঁর সহযাত্রী শামসুর রাহমান, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের তুলনায় এইখানে তিনি ব্যতিক্রমী ও প্রাগ্রসর। নাগরিক চেতনায় আল মাহমুদ মাটিজ অনুভূতিতে গ্রামীণ শব্দপুঞ্জ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা এবং চিত্রকল্প সংশ্লেষ করে আধুনিক বাংলা কবিতার নতুন দিগন্ত রেখায়িত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি কথাসাহিত্যে তাঁর মৌলিক শৈলীর স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ অভ্যূদয়ের পর তিনি দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯০ দশক থেকে ব্যক্তি জীবনে ইসলামের অনুবর্তী হয়ে তিনি সমালোচনার শিকার হয়েছেন। ==জন্ম== আল মাহমুদ([[১৯৩৬]]-)খ্রিস্টাব্দে [[ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা]]র মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ।তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। == প্রকাশিত গ্রন্থ == {{div col|3}} * লোক লোকান্তর ([[১৯৬৩]]) * কালের কলস (১৯৬৬) * সোনালী কাবিন ([[১৯৬৬]]) * মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো ([[১৯৭৬]]) * আরব্য রজনীর রাজহাঁস * বখতিয়ারের ঘোড়া * Al Mahmud In English * দিনযাপন * দ্বিতীয় ভাংগন * একটি পাখি লেজ ঝোলা * আল মাহমুদরে গল্প * গল্পসমগ্র * প্রেমের গল্প * যেভাবে গড়ে উঠি * কিশোর সমগ্র * কবির আত্নবিশ্বাস * কবিতাসমগ্র * কবিতাসমগ্র-২ * পানকৌড়ির রক্ত * সৌরভের কাছে পরাজিত * গন্ধ বণিক * ময়ূরীর মুখ * না কোন শূণ্যতা মানি না * নদীর ভেতরের নদী * পাখির কাছে , ফুলের কাছে * প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা * প্রেম প্রকৃতির দ্রোহ আর প্রার্থনা কবিতা * প্রেমের কবিতা সমগ্র * উপমহাদেশ * বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ * উপন্যাস সমগ্র-১ * উপন্যাস সমগ্র-২ * উপন্যাস সমগ্র-৩ * ত্রিশেরা ==কর্মজীবন== সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি [[ঢাকা]] আসেন [[১৯৫৪]] সালে। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। তিনি পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। [[১৯৫৫]] সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর([[১৯৬৩]]) সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস([[১৯৬৬]]),সোনালি কাবিন([[১৯৬৬]]), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো([[১৯৬৯]]) কাব্যগ্রন্থ গুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। [[১৯৭১]] এর মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। [[১৯৭৫]] সালে তার প্রথম ছোট গল্পগ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। [[১৯৯৩]] সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল। আল মাহমুদ সাংবাদিক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি দৈনিক গণকন্ঠ পত্রিকাত সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী [[আওয়ামী লীগ]] সরকারের সময় একবার জেল খাটেন । পরে তিনি শিল্পকলা একাডেমীতে যোগদান করেন এবং পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।