কবিতা

অস্পষ্ট স্টেশন

আমি সারা জীবন একটা স্টেশনের জন্য ধাবমান গাড়ির

জানালায় বসে থাকি। বাইরে কত গ্রাম আর চাষা জমির চলচ্চিত্র।

কুয়াশার ভেতর মানুষের অস্পষ্ট নড়াচড়া।

ভোরের মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসা কর্মনিপুণ কিষানের

মেহেদিরাঙা দাড়ির মতো ভেজা বাতাস। আর

সদ্য দুইয়ে নেওয়া গাভীর বাঁটের মতো হাল্কা মেজাজের বাংলাদেশ।

আমি সব পেরিয়ে যাচ্ছি। প্রতিটি স্টেশন আমার চেনা।

আখ মাড়াইয়ের কল থেকে ছিটকে আসা মাছির ঝাঁক সরিয়ে

আমি নীল রুমালে মুখ মুছে নিয়েছি। যদিও

ঝোল গুড়ের গন্ধে আমার কেবলই খিদে বাড়ে।

মনে হয় আমার সারাজীবনই বুঝি অফুরন্ত শীতকাল।

আমি যতবার সূর্যকে পৃথিবী প্রদক্ষিণের জন্য উঠে দাঁড়াতে দেখলাম

দেখি জেলে পাড়ার শুকোতে দেয়া জালের ভেতর

লালচোখো মাছের তোলপাড়।

নুনের পানিতে ভেজা চোখ কচলে আমি পৃথিবীকে দেখি

প্রথম আমি যার কাছে যাবো তার বাম স্তরের মতোই পৃথিবীটা নিখুঁত,

যা কোন, সুদূর সীমান্তের কাস্টম কলোনিতে আমার জন্য

অকস্মাৎ বিদ্যুতের বোতাম উদাম করে দেখলো।

আমার মনের মধ্যে কেবলই ঘুরে ফিরে স্টেশনটা আসছে,

শুধু নামটাই খেয়া নৌকায় ফেলে আসা পুঁটলিতে চিরকালের

জন্য হারিয়ে এলাম। অগত্যা

রেল কাউন্টারের ঘোলা চশমাপরা টিকেট বিক্রেতাকে

এমন একটা স্টেশনের টিকেট দিতে বললাম

যেখানে কুয়াশা ঢাকা স্টেশনের প্লাটফরমের পাশে

আমার জন্য কেউ না কেউ ঘোমটা তুলে

যাত্রীদের ওঠানামা দেখছে। আর

তার দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসছে অপেক্ষার

ব্যাকুল বাষ্প।

এখন আমার পকেটে আছে হলুদ হালকা বিস্কুটের মতো

কুয়াশা ঢাকা স্টেশনের টিকেট। সাতটা কাব্যগ্রন্থের

অমূল্য দামে আমি তা কিনে নিয়েছি।

গাড়ির দুলুনিতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি আমি

আমি নেমে পড়েছি সেই ষ্টেশনে কুয়াশার সাদা পর্দা ঢাকা প্লাটফরমে

কই, কেউ তো নেই দাঁড়িয়ে?

শুধু স্টেশনের নামটাই দু’হাত তুলে আমাকে সান্ত্বনা দিলো, ফুলতলী।

হ্যাঁ, এই তো সেই নাম যা মেঘনার খেয়াঘাটে আমি ফেলে এসেছি।

আমি সর্ষে ক্ষেতের পাশ দিয়ে, মটরশুঁটির ঝোপ মাড়িয়ে

সেই গাঁয়ের হিজলতলায় দাঁড়াতেই  বৌঁ ঝিরা

মাছের মতো ঝাঁক বেঁধে আমাকে ঘিরে দাঁড়ালো।

পাথরকুচির পাতার মতো তাদের স্বাস্থ্যোজ্জ্বল আনন।

তাদের খোঁপা আর বেনী থেকে ছড়িয়ে পড়ছে

নিসিন্দাÑনিংড়ানো কেশতলের গন্ধ।

তাদের বুকে মাতৃত্বের ঈষৎ হেলানো গৌরব।

তারা একযোগে এক কুটিরবাসিনীকে আহ্বান করে আমাকে ঘিরে

দাঁড়ালো।

একটি ঘর তার ঝাঁপ খুলে দিচ্ছে।

ঐ তো সে। মেঘনার লাফিয়ে ওঠা কালো রুই।

গোধূলিতে ঘর-ফিরতি রাখালদের হাঁকডাকের মতো খুশিতে উপচানো।

পড়ন্ত বেলায় লুকিয়ে পড়া সহস্র শালিক নিয়ে

দাঁড়িয়ে থাকা দেবদারুর মতো দেহ তার। চোখ যেন

রাজ মহীপালের দীঘি।

তার বুকের ভেতর একটি ভারতপাখির মতো আমি

অনন্তে হারিয়ে গেলাম।

আল মাহমুদ
আল মাহমুদ
আল মাহমুদ বাংলা ভাষার প্রধানতম আধুনিক কবিদের একজন। ১৯৩০-এর কবিদের হাতে বাংলা কবিতায় যে আধুনিকতার ঊণ্মেষ, তার সাফল্যের ঝাণ্ডা আল মাহমুদ বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে অদ্যাবধি তুলনারহিত কৃতিত্বের সঙ্গে বহন ক'রে চলেছেন। রবীন্দ্র-বিরোধী তিরিশের কবিরা বাংলা কবিতার মাস্তুল পশ্চিমের দিকে ঘুরিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন;– আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতাকে বাংলার ঐতিহ্যে প্রোথিত করেছেন মৌলিক কাব্যভাষার সহযোগে– তাঁর সহযাত্রী শামসুর রাহমান, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের তুলনায় এইখানে তিনি ব্যতিক্রমী ও প্রাগ্রসর। নাগরিক চেতনায় আল মাহমুদ মাটিজ অনুভূতিতে গ্রামীণ শব্দপুঞ্জ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা এবং চিত্রকল্প সংশ্লেষ করে আধুনিক বাংলা কবিতার নতুন দিগন্ত রেখায়িত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি কথাসাহিত্যে তাঁর মৌলিক শৈলীর স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ অভ্যূদয়ের পর তিনি দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯০ দশক থেকে ব্যক্তি জীবনে ইসলামের অনুবর্তী হয়ে তিনি সমালোচনার শিকার হয়েছেন। ==জন্ম== আল মাহমুদ([[১৯৩৬]]-)খ্রিস্টাব্দে [[ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা]]র মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আব্দুস শুকুর আল মাহমুদ।তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। == প্রকাশিত গ্রন্থ == {{div col|3}} * লোক লোকান্তর ([[১৯৬৩]]) * কালের কলস (১৯৬৬) * সোনালী কাবিন ([[১৯৬৬]]) * মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো ([[১৯৭৬]]) * আরব্য রজনীর রাজহাঁস * বখতিয়ারের ঘোড়া * Al Mahmud In English * দিনযাপন * দ্বিতীয় ভাংগন * একটি পাখি লেজ ঝোলা * আল মাহমুদরে গল্প * গল্পসমগ্র * প্রেমের গল্প * যেভাবে গড়ে উঠি * কিশোর সমগ্র * কবির আত্নবিশ্বাস * কবিতাসমগ্র * কবিতাসমগ্র-২ * পানকৌড়ির রক্ত * সৌরভের কাছে পরাজিত * গন্ধ বণিক * ময়ূরীর মুখ * না কোন শূণ্যতা মানি না * নদীর ভেতরের নদী * পাখির কাছে , ফুলের কাছে * প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা * প্রেম প্রকৃতির দ্রোহ আর প্রার্থনা কবিতা * প্রেমের কবিতা সমগ্র * উপমহাদেশ * বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ * উপন্যাস সমগ্র-১ * উপন্যাস সমগ্র-২ * উপন্যাস সমগ্র-৩ * ত্রিশেরা ==কর্মজীবন== সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি [[ঢাকা]] আসেন [[১৯৫৪]] সালে। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। তিনি পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। [[১৯৫৫]] সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর([[১৯৬৩]]) সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস([[১৯৬৬]]),সোনালি কাবিন([[১৯৬৬]]), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো([[১৯৬৯]]) কাব্যগ্রন্থ গুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। [[১৯৭১]] এর মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। [[১৯৭৫]] সালে তার প্রথম ছোট গল্পগ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। [[১৯৯৩]] সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল। আল মাহমুদ সাংবাদিক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি দৈনিক গণকন্ঠ পত্রিকাত সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী [[আওয়ামী লীগ]] সরকারের সময় একবার জেল খাটেন । পরে তিনি শিল্পকলা একাডেমীতে যোগদান করেন এবং পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।