আমাদের মাকে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি।
আমাদের মা গরিব প্রজার মত দাঁড়াতো বাবার সামনে,
কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ ক’রে উঠতে পারতোনা।
আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে
মাকে আপনি বলার কথা আমাদের কোনোদিন মনেই হয়নি।
আমাদের মা আমাদের থেকে বড় ছিলো, কিন্তু ছিলো আমাদের সমান।
আমাদের মা ছিলো আমাদের শ্রেনীর, আমাদের বর্ণের, আমাদের গোত্রের।
বাবা ছিলেন অনেকটা আল্লার মতো, তার জ্যোতি দেখলে আমরা সেজদা দিতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা সিংহের মতো, তার গর্জনে আমরা কাঁপতে থাকতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা আড়িয়াল বিলের প্রচন্ড চিলের মতো, তার ছায়া দেখলেই
মুরগির বাচ্চার মতো আমরা মায়ের ডানার নিচে লুকিয়ে পড়তাম।
ছায়া সরে গেলে আবার বের হয়ে আকাশ দেখতাম।
আমাদের মা ছিলো অশ্রুবিন্দু-দিনরাত টলমল করতো
আমাদের মা ছিলো বনফুলের পাপড়ি;-সারাদিন ঝরে ঝরে পড়তো,
আমাদের মা ছিলো ধানখেত-সোনা হয়ে দিকে দিকে বিছিয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিলো দুধভাত-তিন বেলা আমাদের পাতে ঘন হয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিলো ছোট্ট পুকুর-আমরা তাতে দিনরাত সাঁতার কাটতাম।
আমাদের মার কোনো ব্যক্তিগত জীবন ছিলো কিনা আমরা জানি না।
আমাদের মাকে আমি কখনো বাবার বাহুতে দেখি নি।
আমি জানি না মাকে জড়িয়ে ধরে বাবা কখনো চুমু খেয়েছেন কি না
চুমু খেলে মার ঠোঁট ওরকম শুকনো থাকতো না।
আমরা ছোট ছিলাম, কিন্তু বছর বছর আমরা বড় হতে থাকি,
আমাদের মা বড় ছিলো, কিন্তু বছর বছর মা ছোটো হতে থাকে।
ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ার সময়ও আমি ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতাম।
সপ্তম শ্রেনীতে ওঠার পর ভয় পেয়ে মা একদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে।
আমাদের মা দিন দিন ছোটো হতে থাকে
আমাদের মা দিন দিন ভয় পেতে থাকে।
আমাদের মা আর বনফুলের পাপড়ি নয়, সারাদিন ঝরে ঝরে পড়েনা
আমাদের মা আর ধানখেত নয়, সোনা হয়ে বিছিয়ে থাকে না
আমাদের মা আর দুধভাত নয়, আমরা আর দুধভাত পছন্দ করিনা
আমাদের মা আর ছোট্ট পুকুর নয়, পুকুরে সাঁতার কাটতে আমরা কবে ভুলে গেছি।
কিন্তু আমাদের মা আজো অশ্রুবিন্দু, গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত
আমাদের মা আজো টলমল করে।
Related Articles
কোথাও কেউ নেই
স্বপ্নের ভিতর থেকে হেঁটে আসে এক সিদ্ধ পুরুষ; সস্নেহে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘চলো’ । অমোঘ নির্দেশের মতো শোনায় তাঁর কণ্ঠস্বর – যেমন বলতেন বাবা ছোটবেলায় ! মন্ত্রাবিস্টের মতো উঠে বসি আমি আর অনুগামী হই নিঃশব্দে অনন্তের পথ ধরে অনন্তকাল – গন্তব্য কোথায় জানিনা । না আলো না আঁধার, অসীমের মতো নিরাকার নির্ভার মনে হয়, ভূত […]
তোর বহির্মুখ, মুখপুড়ি
তোর বহির্মুখী দেহ, আদরক্লান্ত ঘামে, মুখপুড়ি মেছোমেয়ে আলুথালু মরশুমে, বেড়ে ও ফিকিরহীন, অপপ্রচারে, বুঝলি জাহাজ ভাসাতে চাইছে পিম্পদের ঘোড়েল জোয়ারে ! হাউ সিলি ! নো ? কী বলিস, ডারলিং, সুইটি পাই ? তোর নাব্য নগ্নতা গ্লসি কাগজের চারু মলাটে হেলান দিয়ে পুজো সংখ্যার মোটা বেহেডদের পাশে শুয়ে করছেটা কী ? বল তুই ? তোর কোনো […]
মৃত্যুদণ্ড
একটা চিল ডেকে উঠলো দুপুর বেলা বেজে উঠলো, বিদায়, চতুর্দিকে প্রতিধ্বনি, বিদায় বিদায়, বিদায়! ট্রামলাইনে রৌদ্র জ্বলে, গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়েছিলাম আমি হঠাৎ যেন এই পৃথিবী ডেকে দেখালো আমায় কাঁটা-বেধাঁনো নগ্ন একটি বুক; রূপ গেল সব রূপান্তরে আকাশ হল স্মৃতি ঘুমের মধ্যে ঘুমন্ত এক চোখের রশ্মি দেখে অন্ধকারে মুখ লুকালো একটি অন্ধকার। হঠাৎ যেন বাতাস মেঘ […]


