কবিতা

প্রলেতারিয়েত

যতক্ষণ তুমি কৃষকের পাশে আছো,
যতক্ষণ তুমি শ্রমিকের পাশে আছো,
আমি আছি তোমার পাশেই।
যতক্ষণ তুমি মানুষের শ্রমে শ্রদ্ধাশীল
যতক্ষণ তুমি পাহাড়ী নদীর মতো খরস্রোতা
যতক্ষণ তুমি পলিমৃত্তিকার মতো শস্যময়
ততক্ষণ আমিও তোমার।

এই যে কৃষক বৃষ্টিজলে ভিজে করছে রচনা
সবুজ শস্যের এক শিল্পময় মাঠ,
এই যে কৃষক বধূ তার নিপুণ আঙুলে
ক্ষিপ্র দ্রুততায় ভেজা পাট থেকে পৃথক করছে আঁশ;
এই যে রাখাল শিশু খররৌদ্রে আলে বসে
সাজাচ্ছে তামাক আর বারবার নিভে যাচ্ছে
তার খড়ে বোনা বেণীর আগুন,
তুমি সেই জীবন শিল্পের কথা লেখো।

তুমি সেই বৃষ্টিভেজা কৃষকের বেদনার কথা বলো।
তুমি সেই রাখালের খড়ের বেণীতে
বিদ্রোহের অগ্নি জ্বেলে দাও।
আমি তোমার বিজয়গাঁথা করবো রচনা প্রতিদিন।
সেই শিশু শ্রমিকের কথা তুমি বলো, যে তার
দেহের চেয়ে বেশী ওজনের মোট বয়ে নিয়ে যায়,
ব্রাশ করে জুতো, চালায় হাঁপর, আর বর্ণমালাগুলো
শেখার আগেই যে শেখে ফিল্মের গান,
বিড়ি টানে বেধড়ক। তারপর একদিন ফুঁটো ফুসফুসে
ঝরিয়ে রক্তের কণা টানে যবনিকা জীবনের।
তুমি সেই শিশু শ্রমিকের বেদনার কথা বলো।
আমি তোমার কবিতাগুলো গাইবো নৃত্যের তালে তালে
বুদ্ধিজীবীদের শুভ্র সমাবেশে। তুমি উদ্বৃত্ত মূল্যের সেই
গোপন রহস্য বলে দাও, আমি তোমার পেছনে আছি।

যতক্ষণ তুমি সোনালী ধানের মতো সত্য,
যতক্ষণ তুমি চায়ের পাতার মতো ঘ্রাণময়,
যতক্ষণ তুমি দৃঢ়পেশী শ্রমিকের মতো প্রতিবাদী,
যতক্ষণ তুমি মৃত্তিকার কাছে কৃষকের মতো নতমুখ,
ততক্ষণ আমিও তোমার।

তৃমি রুদ্র কালবোশেখীর মতো নেমে আসো
নগরীর এই পাপমগ্ন প্রাসাদগুলোর বুকে
বজ্র হয়ে ভেঙ্গে পড়ুক তোমার নতুন কাব্যের ছন্দ
শিরস্ত্রাণপরা শোষকের মাথার উপরে।
আমি তোমার বিজয় বার্তা করবো ঘোষণা জনপদে।

তুমি চূর্ণ করো অতি-বুদ্ধিজীবীদের সেই ব্যূহ,
কৃত্রিম দর্শন আর মেকি শিল্পর প্রলেপে
যো আছে আড়াল করে সত্য আর সুন্দরের মুখ।
আমি তোমার পেছন আছি । তুমি খুলে দাও সেই
নব জীবনের দ্বার, পরশনে যার পৃথিবীর অধিকার
ফিরে পায় প্রলেতারিয়েত।

আমি এই বীরভোগ্যা বসুন্ধরা দেবো তোমাকেই।

      Proletariet - Kamrul Hasan Monju

নির্মলেন্দু গুন
নির্মলেন্দু গুন
জন্ম: জুন ২১, ১৯৪৫ (আষাঢ় ৭, ১৩৫২ বঙ্গাব্দ), কাশবন, বারহাট্টা, নেত্রকোণা বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিদেরও একজন তিনি। মাত্র ৪ বছর বয়সে মা বীনাপনিকে হারান তিনি ৷ মা মারা যাবার পর তাঁর বাবা আবার বিয়ে করেন৷ শিক্ষাজীবন বারহাট্টা স্কুলে ভর্তি হন শুরুতে৷ স্কুলের পুরো নাম ছিলো করোনেশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইন্সটিটিউট। দুই বিষয়ে লেটারসহ মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ পান ১৯৬২ সালে৷ মাত্র ৩ জন প্রথম বিভাগ পেয়েছিল স্কুল থেকে৷ বাবা তাঁর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন- “কৃষ্ণ কৃপাহি কেবলম। মেট্রিক পরীক্ষার আগেই নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণের প্রথম কবিতা ‘নতুন কান্ডারী’৷ মেট্রিকের পর আই.এস.সি পড়তে চলে আসেন ময়মনসিংহেরআনন্দমোহন কলেজে৷ মেট্রিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের সুবাদে পাওয়া রেসিডেন্সিয়াল স্কলারশিপসহ পড়তে থাকেন এখানে৷ নেত্রকোণায় ফিরে এসে নির্মলেন্দু গুণ আবার ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকা ও তাঁর কবি বন্ধুদের কাছে আসার সুযোগ পান৷ নেত্রকোণার সুন্দর সাহিত্যিক পরিমন্ডলে তাঁর দিন ভালোই কাটতে থাকে৷ একসময় এসে যায় আই.এস.সি পরীক্ষা৷ ১৯৬৪ সালের জুন মাসে আই.এস.সি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডের ১১৯ জন প্রথম বিভাগ অর্জনকারীর মাঝে তিনিই একমাত্র নেত্রকোণা কলেজের৷ পরবর্তীতে বাবা চাইতেন ডাক্তারী পড়া৷ কিন্তু না তিনি চান্স পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগে৷ ভর্তির প্রস্তুতি নেন নির্মলেন্দু গুণ ৷ হঠাত্‍ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয় ঢাকায়৷ দাঙ্গার কারণে তিনি ফিরে আসেন গ্রামে৷ ঢাকার অবস্থার উন্নতি হলে ফিরে গিয়ে দেখেন তাঁর নাম ভর্তি লিষ্ট থেকে লাল কালি দিয়ে কেটে দেওয়া৷ আর ভর্তি হওয়া হলো না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ ফিরে আসেন গ্রামে৷ আই.এস.সি-তে ভালো রেজাল্ট করায় তিনি ফার্স্ট গ্রেড স্কলারশিপ পেয়েছিলেন৷ মাসে ৪৫ টাকা, বছর শেষে আরও ২৫০ টাকা৷ তখনকার দিনে অনেক টাকা৷ ১৯৬৯ সালে প্রাইভেটে বি.এ. পাশ করেন তিনি ( যদিও বি.এ. সার্টিফিকেটটি তিনি তোলেননি। ১৯৬৫ সালে আবার বুয়েটে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন৷কর্মজীবনঃ স্বাধীনতার পূর্বে তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সাংবাদিকতায়ও জড়িত ছিলেন।সাহিত্য ধারাঃ তিনি প্রধানত একজন আধুনিক কবি। শ্রেণীসংগ্রাম, স্বৈরাচার-বিরোধিতা, প্রেম ও নারী তার কবিতার মূল-বিষয় হিসেবে বার বার এসেছে। কবিতার পাশাপাশি ভ্রমণ কাহিনীও লিখেছেন। নিজের লেখা কবিতা এবং গদ্য সম্পর্কে তার নিজের বক্তব্য হলো - “ অনেক সময় কবিতা লেখার চেয়ে আমি গদ্যরচনায় বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। বিশেষ করে আমার আত্মজৈবনিক রচনা বা ভ্রমণকথা লেখার সময় আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে আমি যে গদ্যটি রচনা করতে চলেছি, তা আমার কাব্য-রচনার চেয়ে কোনো অর্থেই ঊনকর্ম নয়। কাব্যকে যদি আমি আমার কন্যা বলে ভাবি, তবে গদ্যকে পুত্রবৎ। ওরা দুজন তো আমারই সন্তান। কাব্যলক্ষ্মী কন্যা যদি, গদ্যপ্রবর পুত্রবৎ। ” বহুল আবৃত্ত কবিতাসমূহের মধ্যে - হুলিয়া, অসমাপ্ত কবিতা, মানুষ (১৯৭০ প্রেমাংশুর রক্ত চাই), আফ্রিকার প্রেমের কবিতা (১৯৮৬ নিরঞ্জনের পৃথিবী) - ইত্যাদি অন্যতম।