কবিতা

মরণ-বিরোধী পঙ্‌ক্তিমালা

আমি গোলাকার চাঁদ এবং জ্যোস্নাধারার কথা
চিন্তা করি, অথচ ঘোর অমাবস্যা
ধেয়ে আসে আমার দিকে। মনে হয়, একটা
কুচকুকে কালো কাফন আমাকে ঢেকে ফেলেছে।

দম বন্ধ হয়ে আসছে। তাহলে
আমার দিন কি ফুরিয়ে এলো? চিরকালের জন্যে
নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এই শরীর আমার,
যাকে কত যত্নেই না ধুলোবালি, নোংরা
আবর্জনা থেকে বাঁচিয়ে রেখেছি? শরীর একটু
বিগড়ে গেলেই তো ধর্না দিই চিকিৎসকের দুয়ারে।

এই যে আমি বন্ধুদের মজলিশে দিলখোশ গল্পে
মেতে থাকি কখনও সখনও, এই যে চার বছরের
পৌত্রী দীপিতার কষ্ট ভোলানো
হাসির ঝলক আমাকে কোনও পবিত্র এলাকায়
নিয়ে যায় অথবা কোনও বিগত কবির পঙ্‌ক্তিমালা
আমার চেতনায় অপরূপ পাখি হয়ে
ভাসতে থাকে, তখন আমার নামের আড়ালে
যে সত্তার বসবাস, তার জন্যে মন কেমন উদাস হয়ে যায়।
যদি বলি, মৃত্যুকে আমি ঘৃণা করি, মৃত্যুর মুখ দেখার
কোনও সাধ নেই আমার,
তবে কি এ কথা শুনে সবাই হেসে উঠবে
ঘরদোর কাঁপিয়ে? মরণের ভয়ানক চোখমুখবিহীন
মুখ দেখার, জীবনের শপথ, সত্যি বলছি
এক কণা সাধ নেই এই বান্দার।

শামসুর রাহমান
শামসুর রাহমান
শামসুর রাহমান (জন্মঃ অক্টোবর ২৪, ১৯২৯, মাহুতটুলি, ঢাকা - মৃত্যুঃ আগস্ট ১৭, ২০০৬ ) বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে দুই বাংলায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠিত। তিনি একজন নাগরিক কবি ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লিখিত তাঁর দুটি কবিতা খুবই জনপ্রিয়। জন্ম, শৈশব ও শিক্ষাঃ জন্ম নানাবাড়িতে। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মা আমেনা বেগম। পিতার বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরায় পাড়াতলী গ্রামে। কবিরা ভাই বোন ১৩ জন। কবি ৪র্থ। পুরোনো ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ১৯৪৫ সালে। ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হন এবং তিন বছর নিয়মিত ক্লাসও করেছিলেন সেখানে। শেষ পর্যন্ত আর মূল পরীক্ষা দেননি। পাসকোর্সে বিএ পাশ করে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এম এ (প্রিলিমিনারী) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। পেশাঃ শামসুর রাহমান পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। এরপর তিনি আবার ফিরে আসেন তার পুরানো কর্মস্থল দৈনিক মর্ণিং নিউজ-এ। তিনি সেখানে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[১] নভেম্বর, ১৯৬৪ থেকে শুরু করে সরকারি দৈনিক দৈনিক পাকিস্তান এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৭ এর জানুয়ারি পর্যন্ত (স্বাধীনতা উত্তর দৈনিক বাংলা)। ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ তে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাকেঁ পদত্যাগ বাধ্য করা হয়।অতঃপর তিনি অধুনা নামীয় মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুঃ কবি শামসুর রাহমান ২০০৬ সালের ১৭ই আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬ টা বেজে ৩৫ মিনিটে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ঢাকাস্থ বনানী কবরস্থানে, তাঁর মায়ের কবরে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।