কবিতা

গোলাপ, তোমার মর্ম

গোলাপ বিষয়ে কোনো সূক্ষ্ম অনুভূতি
প্রেমিকের মতো কোনো গভীর মুগ্ধতা-
আমার তেমন কিছু নেই;
গোলাপের কাছে আমি পর্যটক, বিদেশী পথিক
বড়ো জোর এমন সম্পর্ক হে বন্ধু বিদুয়, দেখা হবে।
আমি তাই গোলপকে গোলাপ বলি না
বলি মহিমার ফুল, বলি মৃত্যু, বলি মর্মান্তিক।
সম্পূর্ণ নির্দোষ নগ্ন, আঙুলে কাঁটার কালো ক্ষত
কালো বিষ, কালো অন্ধ প্যারিসের পতের ভিক্ষুক, পাপী
ঘোর গৃহত্যাগী। গোলাপ সম্পকে ঠিক নদীর মতন সম্পূর্ণ
ধারণা কিছু নেই
গোলাপ বিষয়ৈ জ্ঞান বড়ো অসম্পূর্ণ,
গোলাপ, তোমাকে ঠিক বুঝতে পারি না।
হয়তো নদী সম্পর্কে আমার এক ধরনের দুর্বলতা আছে
কোথাও কোনোভাবে নদীর কাছে বাঁধা পড়েছি,
তাই বলে গোলপবিরোধী আমি নই
এখনো বহু রাত আমি গোলাপের স্বপ্নে ঘুমাতে পারি না
দৃঢ়বন্ধে জপটে ধরি গোলাপ, গোলাপ ভেবে ঘুম ও মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা
গোলাপ বস্তুত এই ঘুমের মঘ্যে স্বপ্ন;

জেগে উঠেই গোলাপ দেখি রক্তমাখা, গোলাপ দেখি কলুষকালো
গোলাপ দেখি গভীর গোপন অসুস্থতায় অবসন্ন, মর্মে ভীষণ বিষের ফণা।
সেই একবার বাল্যে আমি গোলপ ছুঁয়ে সংজ্ঞা হারিয়েছিলাম
আরো একবার কৈশোরে গোলাপ দেখে আতঙ্কিত,
তারপর পর্যটনে নেমে একে একে গোলাপ বিষয়ৈ
এই অভিজ্ঞতা।
এখন গোলাপ বিষয়ে আমার তেমন কোনো সূক্ষ্ম অনুভূতি নেই
গোলাপ বিষয়ে আমার জ্ঞান বড়ো অস্বচ্ছ, বড়ো অগভীর
তাকে যতোটা জানি সে মাত্রই একজন পর্যটকের মতো
কিংবা একজন কৃষকের মতো।
এক সময় গোলাপের মধ্যে আমি নদীর কুলুকুলু কান্না শুনেছিলাম
মানুষের বিশুদ্ধ আত্মপ্রকাশের শিল্প দেখেছিলাম
গোলাপের সৌন্দর্যে।
সেই মুগ্ধতা এখন আমার নেই, সত্যি বলছি গোলাপ বিষয়ে
এখন আমি সাধারণ একজন কৃষক মাত্র;
ঠিক গোলাপ নয় আমি অরণ্য-উদ্ভিদ খুঁজতে এসেছি
হয়তো পাথর তুলতে এসেছি
তবু আমি গোলাপকে গোলাপ বলি না
বলি স্বপ্ন, বলি মৃত্যু, বলি মর্মান্তিক।

মহাদেব সাহা
মহাদেব সাহা
(জন্ম: ৫ আগস্ট ১৯৪৪) বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালের একজন অন্যতম প্রধান কবি।১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট পাবনা জেলার ধানঘড়া গ্রামে পৈতৃক বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বগদাধর সাহা এবং মাতা বিরাজমোহিনী।তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৯৩ টি। কাব্যগ্রন্থ এই গৃহ এই সন্ন্যাস (১৯৭২), মানব এসেছি কাছে, চাই বিষ অমরতা, কী সুন্দর অন্ধ, তোমার পায়ের শব্দ, তবু স্বপ্ন দেখি, সোনালী ডানার মেঘ, পৃথিবী তোমাকে আমি ভালোবাসি, কে পেয়েছে সব সুখ, সবটুকু মধু,, শুকনো পাতার স্বপ্নগাঁথা, দুঃসময়ের সঙ্গে হেঁটে যাই, দুঃখ কোন শেষ কথা নয়, ভালোবাসা কেন এতো আলো অন্ধকারময়, লাজুক লিরিক-২, দূর বংশীধ্বনি, অর্ধেক ডুবেছি প্রেমে - অর্ধেক আধারে, কালো মেঘের ওপারে পূর্ণিমা, সন্ধ্যার লিরিক ও অন্যান্য, মহাদেব সাহার রাজনৈতিক কবিতা (কাব্য-সংকলন), মহাদেব সাহার প্রেমের কবিতা (কাব্য-সংকলন), মহাদেব সাহার কাব্যসমগ্র (কাব্য-সংকলন) - ১ম খণ্ড, ২য় খন্ড, ৩য় খন্ড, ৪র্থ খন্ড, মহাদেব সাহার শ্রেষ্ঠ কবিতা (কাব্য-সংকলন), প্রেম ও ভালবাসার কবিতা (কাব্য-সংকলন), নির্বাচিত ১০০ কবিতা (কাব্য-সংকলন), নির্বাচিত একশ (কাব্য-সংকলন), প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতা(কাব্য-সংকলন), প্রবন্ধ আনন্দের মৃত্যু নেই মহাদেব সাহার কলাম কবিতার দেশ ও অন্যান্য ভাবনা মহাদেব সাহার নির্বাচিত কলাম শিশুসাহিত্য টাপুর টুপুর মেঘের দুপুর ছবি আঁকা পাখির পাখা আকাশে ওড়া মাটির ঘোড়া সরষে ফুলের নদী আকাশে সোনার থালা মহাদেব সাহার কিশোর কবিতা পুরস্কার ও সম্মাননা --------------------------------- মহাদেব সাহা তাঁর কাব্য প্রতিভার জন্য অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি ১৯৮৩ সালে কবিতায় বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়াও অন্যান্য পুরস্কার ও সম্মননার মধ্যে ১৯৯৫ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার, ২০০২ সালে খালেদদাদ চৌধূরী স্মৃতি পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার অন্যতম।

One thought on “গোলাপ, তোমার মর্ম

  1. কবির ‘গোলাপ-দর্শন’ অসাধারন । লাল গোলাপকে তিনি শুধু সাদা চোখেই দেখেননি, দেখেছেন তাঁর সুগভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে – যা গোলাপের পার্থিব শারীরি সৌন্দর্যকে এক অপার্থিব স্বর্গীয় সোপানে উন্নীত করেছে ।

    ‘Positivism through Negetivity’ – অর্থাৎ ‘না’ বলে ‘হ্যা’ বোঝানোর যে বিশেষ অসাধারন প্রকাশভঙ্গী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের রয়েছে, তার সার্থক উদাহরণ কবি মহাদেবের ‘গোলাপ – তোমার মর্ম’ । কারন, ‘গোলাপ, তোমাকে ঠিক বুঝতে পারি না’ কবি যতই বলুন, মরমে-মরমে গোলাপের প্রতি পুঞ্জীভূত তাঁর গভীর প্রেম পাঠকের কাছে আর গোপন থাকেনি যখন তিনি না বলে পারেননি ‘এখনো বহু রাত আমি গোলাপের স্বপ্নে ঘুমাতে পারি না’ ।

Comments are closed.