অল্পকথা ডট কম

স্বর্নালী দিনের স্পর্শ

সাথে থাকুন

Download

গান শুনতে এখানে ক্লিক »করুন !

Member Login

Lost your password?

Not a member yet? Sign Up!

হুমায়ূনঃ পুরুষতন্ত্রের সম্রাট

লিখেছেনঃ

Share on Facebook Share on Facebook

হুমায়ূন আহমেদের যে ক্যান্সারটি হয়েছিল, সেই একই ক্যান্সার আমার মায়ের হয়েছিল। আমার মা মারা যান সাতান্ন বছর বয়সে, হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন তাঁর চৌষট্টি বছর বয়সে। এক দশকের বেশি হল আমার মা মারা গেছেন, আর এই সেদিন মারা গেছেন হুমায়ূন আহমেদ। আমার মা নামি দামি কেউ ছিলেন না, সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন ভয়ঙ্কর জনপ্রিয় লেখক। হুমায়ূন আহমেদ-এর মারা যাওয়ার খবর শুনে আমি বিস্মিত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি। মা’র কথা মনে পড়েছে, একই রকম অসুখে তিনিও ভুগেছিলেন। নাহ, নিউ ইয়র্কের স্লোন কেটেরিং বা বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসা করার সামর্থ আর সুযোগ কোনোও টাই আমার মা’র ছিল না। এক রকম বিনা চিকিৎসায় তিনি মারা গেছেন। আমার মা দেশের লক্ষ লক্ষ দুর্ভাগা মায়ের মত এক মা। অসুখের শেষ অবস্থায় যাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়, যখন তাদের বাঁচবার আর সময় থাকে না, আমার মা তেমন এক মা। কোলন ক্যান্সার বড় হয়ে হয়ে খাদ্যনালী বন্ধ করে ফেললে অথবা লিভারে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে গিয়ে বিচ্ছিরি অবস্থা করলে কেউ হয়তো তাদের দয়া করে হাসপাতালে নিয়ে যায়, এর আগে নয়।

যতদিন বেঁচে থাকি আমার মা’র জন্য আমি কাঁদবো, আরও শত শত মা’র জন্য কাঁদবো, চিকিৎসার অভাবে যারা মৃত্যুকে বরণ করতে বাধ্য হয়। কাঁদবো দারিদ্র্য আর পরাধীনতার শেকলে বন্দী বাংলার সহস্র মা’র জন্য। কাঁদবো সেই লক্ষ কোটি অসহায় মানুষের জন্য, প্রচুর প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও শুধু মেয়ে জন্মানোর কারণে যাদের অন্ধকারে পড়ে থাকতে হয়, তাদের জন্য।

হুমায়ূন আহমেদকে ভুগতে হয়নি, কারণ তিনি পুরুষ। তাঁকে হাঁটতে হয়নি কোনও অমসৃণ পথে, যে পথে প্রতিটি মেয়েকেই হাঁটতে হয়। হুমায়ূন আহমেদের জন্য সম্ভবত আমার কষ্ট হবে না দীর্ঘদিন। কারণ হুমায়ূন আহমেদ জীবনে যা চেয়েছেন তাই পেয়েছেন, যা ইচ্ছে করেছেন তাই করেছেন। রাজা হতে চেয়েছেন, রাজা হয়েছেন। বাদশাহী উপভোগ করতে চেয়েছেন, উপভোগ করেছেন। পৃথিবীর খুব কম মানুষই জীবনে এত ভোগ বিলাস করার সুযোগ পান। খুব কম মানুষই নিজের যাবতীয় স্বপ্নকে সফল করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। এই জীবনে কে কার চেয়ে বেশি যশ আর খ্যাতি লাভ করতে পারে, তার একটা ভীষণ প্রতিযোগিতা চলে। হুমায়ূন আহমেদ সেই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশে যারা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত, তাদের হাজার মাইল পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে ছিলেন। তার নাগাল কেউ স্পর্শ করতে পারে নি। তাঁর মতো সৌভাগ্যবান মানুষ আমার জীবনে আমি আর দেখিনি। তিনি চলে গেছেন। এরকম সবাই যাবে, কেউ দুটো বছর আগে যাবে, কেউ দুটো বছর পরে। এই সম্ভাবনা আমার মনে হয় না খুব বেশি ছিল যে বেঁচে থাকলে তিনি নতুন ধরনের কোনো লেখা লিখতেন বা সাহিত্য জগত কে বিশাল কিছু দান করতেন। আমরা মানুষ টি কে হারিয়েছি, এটাই যা ক্ষতি, তার চলে যাওয়ায় সত্যি বলতে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতের কোনও ক্ষতি হয়নি।

হুমায়ূন আহমেদের লেখা আমি পড়তাম আমার কিশোরী বয়সে। যখন থেকে আমি বাংলায় এবং অন্যান্য ভাষায় উন্নতমানের সাহিত্য পড়তে শুরু করেছি, হুমায়ূন আহমেদ পড়া আমার পক্ষে আর সম্ভব হয়নি, এবং যখন থেকে আমার ভালো নাটক দেখার রুচি বোধ গড়ে উঠলো, আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখা। কিন্তু কী করে লক্ষ লক্ষ মানুষ হুমায়ূন আহমেদের শত শত রম্য রচনা পড়ে গেছে যুগের পর যুগ? এর উত্তর হতে পারে, তারা রম্য রচনারই পাঠক, রম্য রচনা ছাড়া আর কোনও রচনার যোগ্য নয় তারা, অথবা পাঠক হিসেবে তাদের বিবর্তন ঘটেনি, অথবা অল্প শিক্ষিত বলে হুমায়ূন আহমদের বই আর নাটকের ছোটো ছোটো সুখ দুঃখ আর সহজ সরল কৌতুক বোঝা তাদের জন্য সুবিধে। বাংলাদেশের জনগণ যদি এত বিপুল পরিমাণে অশিক্ষিত আর অর্ধশিক্ষিত না হত, হুমায়ূন আহমেদের পক্ষে এত প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা অর্জন করা সম্ভব হত না। বাংলার প্রকাশকরা, হুমায়ূনের বন্ধু সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদাররা বছরের পর বছর প্রবল চেষ্টা করেও পাশের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে হুমায়ূন আহমেদকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারেননি। এর কারণ সম্ভবত একটিই, ওই রাজ্যে শিক্ষিতের মানটা বাংলাদেশের চেয়ে তুলনায় সামান্য বেশি।

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয় তিনি বেজায় রকম বিখ্যাত হওয়ার আগে। তার যে গুণটি আমার প্রথমেই চোখে পড়েছে, তা হল তিনি গল্প বলে ঘরোয়া আসর জমিয়ে রাখতে পারেন। অসাধারণ স্টোরি টেলার। একবার তিনি আমাদের ময়মনসিংহের বাড়িতে হঠাৎ চলে এলেন। বললেন, নেত্রকোণা গিয়েছিলেন, ঢাকায় ফেরার পথে ভাবলেন আমার সঙ্গে দেখা করে যাবেন। আমাদের বাড়িটা কল্পনা করে নিয়েছেন ব্রহ্মহ্মপুত্রের পাড়ে একটা লাল বাড়ি। সেই কল্পনার বাড়িটি তিনি খুঁজছিলেন, যত লাল বাড়ি আছে নদীর পাড়ে, দরজা ধাক্কিয়ে ওদের জিজ্ঞেস করেছেন, আমি আছি কি না। শেষে নাকি তার রিক্সাওয়ালাই নিয়ে এলো ঠিক বাড়িটিতে। সারাদিন ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। একাই গল্প বলে গেলেন, বাড়ির সবাই মুগ্ধ হয়ে হুমায়ূন আহমেদের গল্প শুনেছিল। আমার বিশ্বাস তিনি যদি সারারাতও ঠিক ওভাবে গল্প বলে যেতেন, সবাই মুগ্ধ হয়ে ওভাবেই শুনতো আর থেকে থেকে ঘর ফাটিয়ে হেসে উঠতো। হাসাতে জানতেন। অনেক গুণ ছিল হুমায়ূন আহমেদের। ইস্কুলের সিলেবাসের বাইরে কোনও বই পড়ার অভ্যেস যাদের নেই, লক্ষ লক্ষ সে সব সাধারণ মানুষকে তিনি তাঁর বই পড়িয়ে ছেড়েছেন। অনেকে আছে জীবনে একটিই গল্পের বই পড়েছে, গল্পের বইটি হুমায়ূন আহমেদের। এক সময় ভাবা হত, হুমায়ূন আহমেদ পাঠক তৈরি করেছেন। তাঁর বই পড়ে পড়ে পাঠকের বই পড়ার অভ্যেস গড়ে উঠবে, বোধোদয় হবে, রুচি পাল্টাবে, তখন আর হুমায়ূন আহমেদ না পড়ে অন্য লেখকের বই পড়বে। ভাবনাটি ভুল ছিল। হুমায়ূন আহমেদ পাঠক তৈরি করেছেন, তবে সেই পাঠককে জীবনভর নিজের বই পড়ার জন্যই তৈরি করেছেন, অন্য কারও বই পড়ার জন্য নয়। তাঁর পাঠককূল খুব কমই বিবর্তিত হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদের ‘নেই’-কে ‘নাই’ লেখাটা আমাকে বরাবরই বড় পীড়া দিয়েছে। জানি না পরে তিনি ‘নাই’ এবং আরও কিছু ভাষার দোষ কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন কি না। অর্ধশিক্ষিত পাঠকদের জন্য পৃথিবীর সব দেশেই কিছু লেখক আছেন, তাঁরা জনপ্রিয় বই লেখেন। তাঁদের প্রায় সবারই মান হুমায়ূন আহমেদের চেয়ে অনেক ওপরে। স্টিফেন কিং, টেরি প্র্যাটচেট। বাংলা ভাষার লেখক ‘শংকর’-এর চটি বইয়ের মানের কথাই ধরা হোক না কেন। ভাষার তুলনা চলুক। শংকর অনেক ওপরে। ভাষায় দক্ষতা না থাকলে ভালো সাহিত্যিক হওয়া যায় না। ঘরের আসর মাতিয়ে রাখতে পারা, বা প্রকাশকের চাপে এক সপ্তাহে বা দু’রাত্তিরে একটা বই লিখে ফেলতে পারা বা তিন দশকে বইয়ের সংখ্যা তিনশ’র বেশি করে ফেলতে পারা মানেই বড় সাহিত্যিক হওয়া নয়। আজ অবশ্য অনেকে হুমায়ূন আহমেদকে ‘বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক’ ইত্যাদি বলছেন। বাংলা ভাষা এবং এর সাহিত্য কে এই অপমানটি কি না করলেই নয়! ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’-এর কথাও উঠছে। আহ, ওরা যদি জানতো ম্যাজিক রিয়ালিজম ঠিক কাকে বলে!

আরও একটি ব্যাপারে আমি বিস্মিত হই। হুমায়ূন আহমেদের মতো বুদ্ধিমান লোক স্ত্রী পুত্র কন্যা ফেলে গোঁড়ালির বয়সী একটা মেয়েকে কেন বিয়ে করেছিলেন! দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি দেখেছি, তা আমাকে ততটা বিস্মিত করেনি, তা হল মিডিয়ার মুখ বুজে থাকা। মিডিয়া চিরকালই ক্ষমতার দাস। খুব কম মিডিয়াই নিরপেক্ষ হওয়ার এবং সত্য কথনের সাহস দেখাতে পারে। আমি বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হাড় মজ্জা অবধি চিনি। ওই সমাজে আমি বড় হয়েছি, ওই সমাজ আমার সঙ্গে কারও সম্পর্কের বা বিয়ের গুজব শুনেই হায়েনার মতো দৌড়ে এসেছে আমাকে আক্রমণ করতে। আমার বিরুদ্ধে বিস্তর মিথ্যে কথা রটিয়ে মিডিয়ার অসংখ্য আমোদ জুটেছে। আমিও জনপ্রিয় লেখক ছিলাম এককালে। আমি যদি আমার স্বামী সন্তান সংসার ত্যাগ করে আমার পুত্রের কোনও বন্ধুকে বিয়ে করে তাকে নিয়ে কোনও বাগান বাড়ি বানিয়ে বাস করতে শুরু করতাম, লোকে আমাকে আক্ষরিক অর্থে ছিঁড়ে ফেলতো, আক্ষরিক অর্থেই কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে রাখতো রাস্তায়, আগুনে পুড়িয়ে মারতো অথবা পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলতো অথবা জ্যান্ত কবর দিয়ে দিত। কারও আমার বই পড়ার তো প্রশ্ন ওঠে না। শুধু আমি নই, অন্য কোনও মেয়েকেও একই রকম করতো এই নষ্ট সমাজ। কোনও অন্যায় না করেও দেশ হারানোর শাস্তি আমি পোহাচ্ছি, অন্যায় করলে পরিণতি কী হত, তা আমি বেশ অনুমান করতে পারি। নারীর মুক্তির জন্য আর মানবাধিকারের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করে গেছি, নিরন্তর লিখে গেছি। আর আমাকেই কিনা দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে ঘৃণ্য জঘন্য অন্যায় যারা করেছে, যারা আমার মাথার দাম ঘোষণা করেছে, তাদের দিব্যি দুধ কলা দিয়ে পোষা হচ্ছে, আর দেশ থেকে জšে§র মতো তাড়ানো হয়েছে আমাকে! আজ উনিশ বছর আমাকে দেশে ফিরতে দেয় না কোনও সরকার। মুখ বুজে মজা দেখছে দেশের তথাকথিত জ্ঞানী গুণী পণ্ডিত এবং মানবাধিকারের পক্ষে লড়াই করা হিপোক্রেটস। লেখক গোর ভিডাল বলেছিলেন, ‘ভালো কাজের সব সময় একটা শাস্তি পাওনা থাকে।’ মিডিয়া যদি পুরুষতান্ত্রিক না হত, আমার বিরুদ্ধে সরকারের অগুনতি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতো। যেহেতু সমাজ পুরুষতান্ত্রিক, মিডিয়াও পুরুষতান্ত্রিক, সে কারণে হুমায়ূন আহমেদ সমালোচিতও হন না, নিন্দিতও হন না বত্রিশ বছরের সংসার ভেঙে সন্তানের বন্ধুকে বিয়ে করার পরও। মিডিয়া তাঁকে ‘নিন্দিত’ হওয়ার কোনও সুযোগই দেয়নি। শুরু থেকে শেষ অবধি তাঁকে সম্বোধন করে গেছে ‘নন্দিত লেখক’ বলে। বাংলাদেশের মিডিয়া এবং মানুষ প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক বলে হুমায়ূন আহমেদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে চরমতম নিন্দার কাজ করেও জীবনভর ‘নন্দিত’ থেকে যাওয়া।

হুমায়ূন আহমেদ নিজে ছিলেন পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী। তাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাঁর ছিল এত আদর। সমাজের নারী বিদ্বেষী পুরুষতান্ত্রিক চরিত্র আরও স্পষ্ট ফুটে উঠেছে হুমায়ুন আহমেদ মারা যাওয়ার পর। গুলতেকিন হুমায়ূন আহমেদের শোক সভায় এসে কেঁদেছেন, এই কান্নার জন্য তাঁকে মহিয়সী রমণী খেতাব দেওয়া হচ্ছে। স্বামী লোচ্চামি, বদমাইশি যা খুশি করুক, তুমি স্বামীকে নিরবধি শর্তহীন ভালবেসে যাও। স্বামী সাত জনের সঙ্গে শুয়ে বেড়াক, হাজার হলেও পুরুষ তো, মেয়ে হয়ে জšে§ছো, তুমি ভাই সতী সাধ্বী থেকে যেও। স্বামী তোমাকে লাথি দিলেও তুমি স্বামীর জন্য কেঁদে বুক ভাসিও। স্বামী তোমাকে ছেড়ে চলে গেলেও, অন্য কার সঙ্গে বাকি জীবন রং-তামাশা করলেও স্বামীর যে কোনও প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িও, সমাজ তোমাকে বাহ্বা দেবে। আমরা ভোগ করবো, তোমরা আমাদের ভোগের বস্তু হবে, বা আমাদের ভগবান জ্ঞান করবে, বা আমাদের স্তুতি গাইবে, আমাদের মঙ্গলের জন্য জীবনপাত করবে। এই না হলে তোমরা আর মেয়ে কেন! হুমায়ূন আহমেদের সন্তানের বয়সী স্ত্রী নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তুচ্ছ করে স্বামীর সেবা করে গেছে, অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে তাঁকে সুস্থ করে তোলার জন্য, তাকেও অনেকে বাহবা দেবে। কেউ কেউ আবার কোনও ত্র“টি খুঁজে পেলে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেবে। কেন? স্বামী দেবতার সেবায় একটু এদিক ওদিক হলে যে রক্ষে নেই!

ক’দিন আগে আমার এক বন্ধু হুমায়ূন আহমেদের একটা লেখা, তার তিন কন্যাকে নিয়ে, পড়তে দিল আমাকে। কন্যাদের সম্ভবত প্রায় দশ বছর পর তিনি দেখেছেন। আমি ভেবেছিলাম পিতা হয়ে যে অন্যায় তিনি করেছেন এর জন্য ক্ষমা চাইবেন। আবেগে কাঁপবে তার কলম। কিন্তু তা নয়, পুরো লেখাটিতেই নিজের গুণগান গেয়েছেন। তিনি নিজে খুব মেধাবী, তাঁর জিন পেয়েছে কন্যারা, সে কারণে তাঁর কন্যারাও মেধাবী। আমি তাজ্জব! হƒদয় বলে কিছু কি ছিল না হুমায়ূন আহমেদের! দেখতে শুনতে গ্রামীণ, সরল সোজা। কিন্তু ভেতরে খুব কঠিন একটি মানুষ। নির্বিকার। নিজের সুখ আনন্দ ছাড়া দুনিয়ার অন্য কিছু থোড়াই হয়তো কেয়ার করেছেন। জনপ্রিয়তা তাঁকে আকাশে বসিয়ে দিয়েছিল, তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান না করলেও বড় তুচ্ছ কিছু একটা জ্ঞান করেছিলেন, ধরার মানুষগুলোকেও হয়তো তা-ই করেছিলেন। কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছিলেন, ক’টা টাকা দেশের মানুষের দারিদ্র্য দূর করতে, অশিক্ষা, কুশিক্ষা দূর করতে খরচ করেছিলেন? ক্যান্সার হাসপাতাল করবেন, ক্যান্সার না হলে বলতেন? নিজের শরীরে বড় রোগ ধরা পড়লে ভয়ে ভয়ে সব ব্যাটাই মানত করে, এই গড়বো, সেই বানাবো ইত্যাদি।

যে কন্যারা অভিমানে দূরে সরে ছিল, কারণ তাদের পিতা তাদের গড়ে তোলার চেয়েও বৃদ্ধ বয়সে এক কন্যাসম কিশোরীর সঙ্গে স্বপ্নের ফানুস ওড়ানো টা কেই যৌক্তিক বলে মনে করছিল, সেই কন্যারা অসুখের খবর শুনে কাছে এলে মিডিয়া খুশি হয়, মানুষ খুশি হয়। ক্ষমতাবানের সামনে সকলে নত হয়। সে বেঁচে থাকলেও হয়, সে মরে গেলেও হয়। পুরুষের ক্ষমতা বলে কথা। সাফল্যের মুখ পুরুষের মুখ। যাদের এক সময় পায়ে ঠেলে দিয়েছিলে তুমি, তারাই এখন তোমার পায়ের কাছে এসে কাঁদছে। কারণ তুমি পুরুষ, তুমি ধনী, তুমি জনপ্রিয়, তুমি রাজা, তুমি বাদশাহ, তুমি সম্রাট, তোমার সাত খুন মাফ। হুমায়ূন আহমেদ অনেকটা ইশ্বরের মতো। নিজের কারণে নয়, ইশ্বরভক্তদের কারণেই ইশ্বর টিকে আছেন।

। সংযুক্তির তারিখঃ আগস্ট ১৪, ২০১২,বিভাগঃ অন্যান্য ,ট্যাগঃ  , , ৯ টি মন্তব্য , ৭৭৪ views, রেটিং করুনঃ FavoriteLoadingপছন্দের পোষ্ট হিসাবে নিন । 90। তসলিমা নাসরিন- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
Custom Search

মন্তব্য (৯), এই পোষ্টের মন্তব্য সমুহ

  1. FORHAD HOSSAIN লিখেছেনঃ

    লেখাটা অনেক বিষয়ে ভাবতে বলছে আমাদের…সুন্দর লেখা

  2. নীল লিখেছেনঃ

    আপনার সব কথাই মিথ্যে বলতে পারছিনা। তবে কিছু কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি, মনে রাখবেন আমি শুধু সেই ব্যাপারগুলো নিয়েই বলছি, যেগুলোতে আমি আপনার সাথে সহমত নই –

    পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার হার যদি সামান্যই বেশী হয়ে থাকে বাংলাদেশের থেকে, তবে বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম লেখকের সেখানে অন্তত জনপ্রিয় হওয়া উচিত ছিল, যেহেতু আপনার কথা অনুযায়ী পার্থক্যটা সামান্য ? এর উত্তর দুটি হতে পারে, আপনি মনে করেন ওপার বাংলার মানুষ অনেক বেশী শিক্ষিত অথবা শিক্ষা / উচ্চ শিক্ষার মান দিয়ে জনপ্রিয়তা মাপা বোকামির শামিল, যেটা আপনি করেছেন।

    আমি মনে করতে পারিনা আপনি এই দেশের কারো ব্যাপারে নিকট অতীতে ভালো কিছু বলেছেন। এমন কি মানবাধিকার কর্মীদের ও বলছেন হিপোক্রেট! তাদেরই বা কি ঠেকা বলেন? আপনার হয়ে দেশে কিছু বলার চেষ্টা করার যেখানে, আপনি নিজে থেকেই বলছেন তারা হিপোক্রেট ? এর অনেক কারন হতে পারে, আমি বলছিনা যে এটাই সত্য তবে , আপনি বর্ডারের যেপারে থাকছেন এখন, সেই পারে আপনার থাকাটাকে জাস্টিফাই করতে আপনার হয়তো ওপার অর্থাৎ বাংলাদেশ কে আপনার জন্য কতটা আনসেফ সেটা মাঝে মাঝে প্রকাশ জরুরী হয়ে পড়ে।

    এবার আসি হুমায়ুন এবং পুরুষতন্ত্রর ব্যাপারে, আপনি নারী বিষয়ক যত ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন, তাঁর বেশির ভাগের সাথেই আমি একমত পোষন করি। যদিও আমি একজন পুরুষ। তবু, আপনি যখন হুমায়ুন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আবারো সেই নারীবাদকে সামনে নিয়ে আসলেন তখন বলিঃ হুমায়ুন যদি নারীও হতো, এবং তিনি যদি আপনার মা ও হতেন, তবুও তাঁর চিকিতসা আমেরিকায় হতো, কারন ওই ক্ষেত্রে নারী/পুরুষ ব্যাপার ছিলনা, বরং অর্থ এবং জনপ্রিয়তাই মূখ্য হতো ক্যন্সারেরে মতো ব্যায়বহুল চিকিত্তসার জন্য। এই ক্ষেত্রে না বলে পারছিনা যে, সব ক্ষেত্রে পুরুষ নারী বৈষম্য টেনে নিয়ে আসা মনে হয় অপ্রাসঙ্গিক।

    আর একটা কথা, বাংলাদেশে এসে করবেন কি বলেন? এই দেশের লোক জন অল্প শিক্ষিত, এই দেশের জনপ্রিয়তম লেখকের ভাষা আপনার কাছে চটি লেখকের ভাষার থেকেও অধম বলে মনে হয়, এবং এই ধরনের আরো যত নেগেটিভীটি আপনি বয়ে বেরাচ্ছেন তাতে করে আমার মনে হয়না, আপনার আসলে দেশে আসার ইচ্ছা আছে, বরং এই নেগেটিভিটি ধারনের মাধ্যমে আপনি আপনার বর্তমান অবস্থানের প্রয়োজনিয়তাকেই ফুটিয়ে তুলছেন। শেষ কথা, যেহেতু আপনি, এই ব্লগে স্বনামে লিখছেন, সুতারাং আমি আশা করিনা যে, আমার পোস্ট এখানে ছাপা হবে………… তবে আশা করতে দোষ কি বলেন ?

  3. মেঘ লিখেছেনঃ

    শিক্ষিত/অতি শিক্ষিত মানুষ হয়ে যদি কেউ চটি ও পড়তে পারে এবং তাঁর যদি সকল চটি লেখকদের মধ্যে বিশেষ কাউকে জনপ্রিয় চটি লেখক বলে মনে হতে পারে। তবে, সহজ এবং সস্তা, আমজনতার ভাষায় যারা সাহিত্য রচনা করে থাকেন, তাদের মধ্যে কাউকে কি জনপ্রিয় হতে হলে কেবল নিম্ন শিক্ষিতদের দুয়ারেই যেতে হবে ?

    উচ্চ শিক্ষিত যেমন আপনি চটিও পড়েন ( পড়তেই পারেন, আমিও পড়ি ) , আপনার কি মনে হয়না যে হুমায়ুনের বই পড়ার ক্ষেত্রে আপনার উচ্চ শিক্ষাই বাঁধা ?

  4. shahina hafiz daisy লিখেছেনঃ

    NIRJOLA SHOTTO ,EKTI KOTHAO MITTHA NOY. ONEK DHONNOBAD LEKHATI UPOHAR DEBAR JONNO.

  5. maruf লিখেছেনঃ

    lekha’ta khub valo laglo, aami besh aage thekei taslima nasrin’er vokto,
    i wiss her success.
    go ahed…

  6. মারুফা মিতু লিখেছেনঃ

    চমৎকার লিখেছেন দুটি প্রসঙ্গে, প্রথম টি ‘হুমায়ূন আহমেদের’ ভোগবিলাসিতার প্রতি মগ্ন হয়ে যাওয়া এবং খুব সঙ্গত কারনেই আর তেমন সৃস্টিশীল লিখা না আসার আশঙ্কা আর দ্বিতীয়টি হলো ‘তিন কন্যাকে’ নিয়ে লিখাটি- মেয়েদের নিয়ে এত হাল্কা লিখা কি করে আসে বিশেষত বড় মেয়ের হিজাব নিয়ে টিপ্পনি!…সম্ভবতঃ ঊনি আর বাবা ছিলেন না, পুরোপুরি ই বদলে যাওয়া অন্য এক মানুষ!!! আপনার লিখাটার বাকি উত্তাপ অনেক ভাবনার অবকাশ রাখে…

  7. নিলয় লিখেছেনঃ

    মারুফা মিতু, আপনার মন্তব্যের সাথে আমি একমত । আর তসলিমার বক্তব্যের বিষয়ে – অবশ্যই বলার আছে অনেক ।

    ব্যক্তি হুমায়ুন আর লেখক হুমায়ুন – এ দুয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক । হুমায়ুন আহমেদের সাহিত্যকর্ম যেমন বাঙ্গালীর মনজুড়ে চিরদিন প্রচন্ড জনপ্রিয় হয়ে থাকবে, তেমনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কর্মকান্ডই এদেশের মানুষের মনে আজীবন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে । আমার মনে হয় এটাই নিরপেক্ষ বাস্তব ।

    তারপরও এ ব্যাপারে যে কারো ব্যক্তিগত ভালো লাগা না লাগা থাকতেই পারে এবং নিজ নিজ মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই সবারই আছে । যেমন আছে তসলিমা নাসরিনের এবং তিনি তা করেছেন যথারীতি তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে । কিন্ত বরাবরের মতই সমস্যা একটাই – বক্তব্য যাই হোক, প্রকাশভঙ্গি । শুধুমাত্র প্রকাশভঙ্গির কারণে যে একটি ভালো কথাও শুনতে খারাপ লাগতে পারে, পাঠকের মনে বিরক্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি করতে পারে – তসলিমার লেখার চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আমার জানা নেই ।

    হুমায়ুন আহমেদ বিষয়ক তসলিমার এ লেখাটিও তার ব্যতিক্রম নয় ।

  8. Shahjahan লিখেছেনঃ

    Simply great! Objective and bold analysis. Thanks a lot, Taslima.

  9. আলী কাওসার লিখেছেনঃ

    হুমায়ুন আহমেদ তো আর নেই। এইবার আপনার লেখা ছাপানো শুরু করুন। বাজার ভালো পাবেন। সস্তা লেখকের দাপট আর সইতে হবেনা। আপনার লেখা যুবকদের কাছে উন্নতমানের চটি।

ই-মেইলের মাধ্যমে নতুন পোষ্ট-এর জন্য

আপনার ই-মেইল লিখুন

,

জুন ২৫, ২০১৭,রবিবার

setubondhon