অল্পকথা ডট কম

স্বর্নালী দিনের স্পর্শ

সাথে থাকুন

Download

গান শুনতে এখানে ক্লিক »করুন !

Member Login

Lost your password?

Not a member yet? Sign Up!

Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.


জে এর জন্য অপেক্ষা

লিখেছেনঃ

Share on Facebook Share on Facebook

করিডোরের ওপাশে থাকা জিউইশ মেয়েটার কাছে রাতের বেলা অনেকে বেড়াতে আসে। মেয়েটা হয়তো প্রস্টিটিউট। গত কয়েক ঘণ্টায় বেশ কয়েকবার পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। টাইপিং বন্ধ করে শুনতে পেলাম, সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসছে কেউ। কিন্তু আমার দরজা পার হয়ে ওই মেয়ের দরজায় গিয়েই শব্দটা থেমে যায় বার বার।

এই তিন ঘণ্টা আগে আমার চল্লিশতম জন্মদিন শুরু হলো। শুরুতে একরকম উৎকণ্ঠা বোধ করছিলাম। মেঝের ওপর হেঁটে বেড়ালাম; মাঝে মাঝে পর্দার ফাঁক দিয়ে নিচে গলির দিকে উঁকি দিয়ে দেখছিলাম। রাত দুইটা বাজার কিছুক্ষণ আগে আমার এই ডেস্কের উপর কিছু অস্ত্র সাজিয়ে রেখেছি আমি। অস্ত্র বলতে হাতের কাছে যুৎসই যা পাওয়া গেছে তা-ই: খোদাইয়ের জন্য ব্যবহার করি এমন দুইটা চিকন বাটালি, ব্রোঞ্জের তৈরি গম্বুজাকৃতির একটা পেপারওয়েট আর কাঠ কাটার ধারালো পাতলা একটা ছুরি। কয়েক মিনিট ধরে এই হাতিয়ারগুলি খুব ভালো করে দেখলাম—ঠিক কীভাবে এগুলি ব্যবহার করা যায় সে সমস্যা নিয়েই ভাবছিলাম আসলে। তারপর বুঝতে পারলাম, এ অস্ত্রের সম্ভার আমার তেমন কোনো কাজেই আসবে না। একটু এলোমেলোভাবে ওগুলি তাই সরিয়ে রাখলাম একপাশে।

জে এর জন্য অপেক্ষা করছি আমি। সেই সাথে বেশ আতঙ্কও কাজ করছে।

কয়েকদিন আগে কাঠ খোদাই করতে গিয়ে আমার ডান হাতের কানি আঙুল একটু কেটে যায়। তারপর থেকে ওই আঙুল দিয়ে কোনো টাইপ-কী চাপ দিলেই ব্যথায় জায়গাটা টন টন করে উঠছে। আমার ঠিক সামনের দেওয়ালটা চকের মতো সাদা। আর বামপাশে রাখা বুকশেলফটা অদ্ভুত ছায়া ফেলেছে ওই দেওয়ালের ওপর।

এখানকার বেশিরভাগ ফার্নিচার কেনা হয়েছিল একটা রুচিশীল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দোকান থেকে। তাই আমার রুমটা বেশ পরিপাটি। বিশেষ করে ফ্লোরের মাঝখানে রাখা কাচের কফি টেবিলটা আমার খুব পছন্দের। ওই টেবিলের ওপর আমি খুব হিসাব করে কয়েকটা জিনিস সাজিয়ে রাখি সবসময়; সেঁকা মাটি দিয়ে বানানো একটা হাতে তৈরি অ্যাশট্রে, কর্ক বসানো কয়েকটা টি-ম্যাট আর স্পেন থেকে কেনা একটা দারুণ কর্ক-স্ক্রু। আমার পাশে ডেস্কের ওপর রাখা গম্বুজাকার পেপারওয়েটটাও ওই টেবিলের ওপরেই থাকে সাধারণত। আমি সবসময় চেষ্টা করি এই আইটেমগুলির জায়গা যেন বদল না হয়। তাই প্রচণ্ড অনিচ্ছার পরেও অস্ত্রের ভাণ্ডার ভারি করার জন্য আজকে ওই পেপারওয়েট সরাতে হয়েছিল।

অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে রুমের কিছু জায়গায় আমি এমন সব ভাস্কর্য রেখেছি যেগুলি বানানোর পর আমার নিজের কাছেই অনেক ভালো লেগেছিল। আমি প্রায়ই মার্বেল নিয়ে কাজ করি, কিন্তু কাঠ আমার বেশি পছন্দের। নরম কাঠ খোদাই করে অনেক আরাম পাই, তাছাড়া আমার টেকনিকও একেবারে ফেলনা নয়। জানালার তাকে রাখা তরুণী দেবীর মূর্তিটা আমার বিশেষ পছন্দের। মোট কথা, কেউ আমার রুমে ঢুকলে সহজেই বুঝতে পারবে যে আমার ভাস্কর্য তৈরির ব্যাপারটা নেহায়েত শখের বশে করা না। মাঝে মাঝে দু’একজন বেড়াতে চলে আসে। যেমন গত সপ্তাহে আমার দুই ছাত্র দাবা খেলার সেটটা ধার নিতে এসেছিল। আধা ঘণ্টারও বেশি ছিল ওরা।

রুমের দুইটা দেওয়াল পুরা বই দিয়ে ঢাকা। প্রচুর পড়াশোনা করি আমি। আর মোটামুটি সবাই এটা স্বীকার করেন যে, দেশের অন্য যে কারো চাইতে নিজস্ব ক্ষেত্রে আমার দখল কোনো দিক থেকেই কম না। গত পনেরো দিন ধরে অবশ্য ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া হয় নি। ওদেরকে বলে রেখেছি আমি অসুস্থ; তাছাড়া আমাকে অবিশ্বাস করার কোনো কারণও নাই। চল্লিশতম জন্মদিন যত এগিয়ে আসছিল, ততই যেন আরো বেশি গম্ভীর হয়ে উঠছিলাম। এই পনেরো দিনে একান্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রুমের বাইরেও যাওয়া হয় নি।

ওর পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে মনে হয়। লেখা বন্ধ করে দিলাম। এত বছর পরেও মনে হচ্ছে ওই শব্দ ঠিকই চিনতে পারব।

না, আমার ধারণা ভুল। পায়ের আওয়াজ আবারো আমার রুম পার করে জিউইশ মেয়েটার ওখানে গিয়ে থামল। সারারাত ধরে কি একজন লোকই মেয়েটার রুমে আসা যাওয়া করছে নাকি প্রতিবার নতুন কারো আগমন—ঠিক বুঝতে পারছি না। বেশ কয়েক মাস ধরেই মেয়েটাকে আমার প্রস্টিটিউট বলে সন্দেহ হচ্ছে। পুরাপুরি নিশ্চিত হতে পারি নাই এখনো। যতবারই দেখা হয়েছে, হয় করিডোরে, নয়ত সিঁড়ির ওখানে। তাই কেবল মাথা ঝাঁকিয়ে বিড় বিড় করে সৌজন্য বিনিময় ছাড়া আর কিছু হয় নাই। ওর চোখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখেছি, অযাচিত কোনো ইঙ্গিত তাতে ছিল না। বেশ ছোটখাটো, পাতলা মেয়েটা। মাথায় হালকা একগোছা চুল, বেশিরভাগ সময় হাঁটু পর্যন্ত লম্বা বুট পরে থাকে। ওর সেই বুট আর রাতের বেলায় এই পায়ের আওয়াজ থেকেই তাকে নিয়ে আমার সন্দেহের সূত্রপাত। আরো একটু জানতে পারলে ভাল লাগত। রুমের একেবারে কোণার দেওয়ালে কান পেতে চেষ্টা করে দেখেছি অনেকবার, রাতের বেলায় মেয়েটার কোনো কাজ কারবারের শব্দ পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু কিছুই শোনা যায় না।

বসে বসে মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা করতে অদ্ভুত একধরনের স্বস্তিবোধ হচ্ছে আমার। এ মুহূর্তে ওই রুমে ঠিক কী কী ঘটতে পারে তাই ভাবছি। মেয়েটাকে কফির দাওয়াত দেওয়ার কথা অনেকবার আমার মাথায় এসেছে।

কিন্তু তারপর আমার চিন্তাভাবনা আবারো আজকে রাতে এসে ঠেকল—আমার চল্লিশতম জন্মদিন এবং জে।

আমার জিউয়িশ প্রতিবেশী আদৌ প্রস্টিটিউট কিনা সেটা নিয়ে চিন্তা করার পেছনে জে-ও অনেকাংশে দায়ী। বহু বছর আগে গ্রামের মুদি দোকানটা থেকে সেদিন যখন স্যালি ক্রোফিক বেরিয়ে আসল, তখন জে-ই তো আমাকে ইশারায় স্যালি’কে দেখিয়েছিল। তখন আমার বয়স এগারো, আর জে-এর সম্ভবত পনেরো হবে। চার্চ হলের বাইরে দেওয়ালটার উপর বসেছিলাম আমরা। জে আমাকে কনুই দিয়ে গুঁতা মেরে স্যালির দিকে দেখাল।

“তোমার তো ওর ব্যাপারে জানার কথা না? কিছু জানো নাকি?” আমাকে জিজ্ঞেস করল জে।

আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। ওকে জিজ্ঞেস করাতে বলল, আমি চাইলে ও আমাকে পরে দেখিয়ে নিয়ে আসবে। জে-র কথাবার্তা শুনে খুবই কৌতূহলী হয়ে গেলাম। ঘটনাটার পুরা ব্যাখ্যা জানতে চাইছিলাম সেদিন দুপুরে। কয়েকবার প্রশ্ন করার পরেও কিছু বলল না ও। শুধু হেসে হেসে বলে, সময় হলে সবই দেখাবে।

জে-কে ভয় পাওয়াটা—ঠিক যেমন আজ আমার চল্লিশতম জন্মদিনের মাঝরাতে বসে ভয় পাচ্ছি ওকে—নতুন কোনো ঘটনা না আমার কাছে। ছোটবেলায়ও খেয়াল করেছি, ওর মধ্যে অস্বাভাবিক একটা ব্যাপার আছে। মাঝে মাঝে আতঙ্কিত হয়ে পড়তাম। আর সেই ভীতির তীব্র আন্দোলন একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেলত। ওর কাছ থেকে অনেক দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতাম শুধু। আমাকে এভাবে প্ররোচিত করার জন্য জে কিছু করেছিল কিনা ঠিক খেয়াল নাই আমার। শুধু মনে আছে, কোনো মাঠ বা নদীর পাশ দিয়ে একসাথে হেঁটে যাবার সময় কখনো ওর ভয় যেন একদম ছেয়ে ফেলত আমাকে। আমি দৌঁড়ানো শুরু করতাম। প্রথম কয়েকবার এরকম করার পর জে আমার পিছু নিত। তাতে আমি আরো জোরে ছুটতে থাকতাম; ক্ষিপ্র উন্মাদের মত।

আমাকে সহজেই ধরে ফেলত ও। ঘাসের ওপর ফেলে দিয়ে হেসে হেসে জানতে চাইত, হুট করে কী হল আমার। হয়ত ও আসলেই বুঝতে পারত না।

এর আগেও আমি ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি, জে এমন কী করে থাকতে পারে যে তাকে নিয়ে আমার এতটা ভয়। কেবল একটা ঘটনাই মনে পড়ে। গ্রামের লম্বা পপলার গাছটার ওখানে লুকিয়ে স্যালি ক্রোফিককে দেখতে গিয়েছিলাম আমরা। সেদিন মনে হয় স্যালির খামারবাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, ঠিক মনে নাই। যাই হোক, একটা চষা জমির পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম, মাঝপথে একটা খরগোশ চোখে পড়ল। খরগোশের চোখ দু’টি যেন প্রচণ্ড কোনো যন্ত্রণার ছন্দে বন্ধ হচ্ছে ও খুলছে। আমি সম্মোহিতের মত তাকিয়ে থাকলাম।

খরগোশটাকে পা দিয়ে খুঁচিয়ে দেখল জে। বলল, ওটাকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে হবে। বলে কোথায় যেন চলে গেল ও। আমি তখনো খরগোশের দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে আছি। এমন না যে আমি ভয় পাচ্ছিলাম বা ওর কষ্ট দেখে করুণা হচ্ছিল খুব। বরং মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম—ছন্দমাফিক ওর চোখের বন্ধ হওয়া ও খুলে যাওয়া এক অদ্ভুত শিহরণ দিচ্ছিল আমাকে।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই জে ফিরে এল। হাঁটু মুড়ে বসে ভারি একটা পাথর দিয়ে থেঁতলানো শুরু করল খরগোশটাকে। মনে হচ্ছিল আজীবন তার থেঁতলানো চলতেই থাকবে।

জে তবু নিরুত্তাপ, যেন খুব মনোযোগ দিয়ে পাথরে কিছু একটা খোদাই করছে।

ওর হাত উঠছে আর নামছে, তাল মিলিয়ে খরগোশের চোখ দু’টা যেন বন্ধ হচ্ছে আর খুলছে। খরগোশটার মাথা শরীর থেকে ততক্ষণে অনেকটাই আলগা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম আমি, অপেক্ষা করছিলাম কখন তার চোখগুলি পুরাপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

হাসতে হাসতে আমাকে হ্যাঁচকা টান মেরে জে বলল, তাড়াতাড়ি না গেলে স্যালি ক্রোফিকের আর দেখা পাওয়া যাবে না। সহসা আমার হাত ধরে একটা জোরে টান মারল ও, আমরা আবার হাঁটা শুরু করলাম। খরগোশের চোখের পাতা তখনো উঠছে আর নামছে।

জিউইশ মেয়েটার রুম থেকে কে যেন বেরিয়ে এসেছে। আমার দরজা পার হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। মেয়েটার দরজা খুলে বের হওয়ার সময় কথা বলার শব্দ পেয়েছিলাম, কিন্তু একটা কথাও বোঝা গেল না। এক বছরেরও বেশি হয়ে গেল আমরা পাশাপাশি থাকি—আমি আর ওই জিউইশ মেয়ে। কোনো এক বিকালে ওকে কফির দাওয়াত দিলে নিশ্চয়ই খুব উদ্ভট কিছু হবে না। এমনকি গত কয়েক মাস ধরে আমি একটা পরিকল্পনা করে রেখেছি। একদিন ওর রুমে গিয়ে বলব, আমার রুমের টেলিফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে, একটা ফোন করতে হবে। সেই ফাঁকে ওর ফোন নাম্বারটা টুকে নেওয়া যাবে।

পেপারের দোকানগুলির জানালায় কয়েকটা পোস্টকার্ড ঝুলতে দেখা যায়। খুবই হাস্যকর কিছু অশ্লীল শিরোনাম থাকে ওগুলির। ওইসব পোস্টকার্ডে দেওয়া টেলিফোন নাম্বারের সাথে মেয়েটার নাম্বার মিলিয়ে দেখব। তবে ওর নাম্বারের সাথে না মিললেই যে ওকে নিয়ে আমার সব সন্দেহ দূর হয়ে যাবে তা না। আপাতত এটুকুই আমার উত্তেজনা বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট, তাছাড়া সামনে আরো প্রমাণ পাওয়ার সম্ভাবনা তো আছেই।

এক ঘণ্টারও বেশি হয়ে গেল আমি লিখছি। আত্মপ্রবঞ্চনা আমার একদম পছন্দ না, তাই জে আসবে না—এমন কিছু ভাবতেও খারাপ লাগছে। তাকে নিয়ে আমার যতই ভীতি কাজ করুক না কেন, তার সাথে আরেকবার দেখা হবে এই আশায় অদ্ভুত এক উত্তেজনা বোধ করছি।

ওর বয়স যখন সতের, তখন জে আমাদের গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। ওর শেষ গ্রীষ্মের বেশিরভাগ সময় আমরা নদীর পাশে ঘুরে ঘুরে কাটিয়েছি। তখন ছিপ দিয়ে খুব ভাল মাছ ধরতে পারি আমি। ওই একটা কাজই জে-র চাইতে ভাল পারতাম। মাঝে মাঝে আমাকে দেখতে আসত জে। নদীর কিনারে বসে ঘণ্টাখানেকের মত গল্প করত। কবে গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে, সারা পৃথিবী জুড়ে ট্রাভেলিং করে বেড়াবে—ওর এসব পরিকল্পনার কথাই বলত আমাকে। প্রথমে যাবে লন্ডন, ওখানে গিয়ে থিয়েটারে চাকরি নিবে। তারপর সেখান থেকে যাবে তুরস্ক। তুরস্ক নিয়ে ওর এত মুগ্ধতা কোত্থেকে আসল তা আর জানা হয় নি কখনো। মেয়েদের ব্যাপারে অনেক গল্প করত জে। দক্ষিণ ফ্রান্স নিয়ে শোনা সব কাহিনি শোনাত আমাকে।

ওই গ্রামে থাকা আর বদ্ধ খোলসের মাঝে জীবন কাটানো নাকি একই কথা। তাই আমার বয়স হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে আসাটাই নাকি বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমার বয়স তখন তের মাত্র। জেক বলেছিল, আমি যেন তাকে কথা দেই—সময় হলে আমিও তার মত গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াব।

চলে যাওয়ার কয়েকদিন আগে আমার মাছ ধরার জায়গায় দেখা করতে এসেছিল জেক। সব পরিকল্পনা করা হয়ে গেছে। লন্ডনে এক বন্ধু ওর জন্য নাটকে একটা পাটের ব্যবস্থা করে রেখেছে। অনেক উৎফুল্ল মনে হচ্ছিল ওকে। মন খুলে আলাপ করল অনেকক্ষণ, আমি আমার মত মাছ ধরছিলাম। সেদিনকার ওর চেহারাটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমার একটু ওপরে বেঢপ পাতলা শরীরটা নিয়ে নদীর খাড়া কিনারে ঘাসের মধ্যে বসেছিল। হাত নেড়ে কী যেন করছিল জেক, আমি প্রথমে ঠিক খেয়াল করি নাই।

“তোমার কথা জানি না,” জেক বলল, “কিন্তু আমি তো কখনোই বুড়া হতে চাই না। বুড়া হওয়ার কোনো অর্থ নাই।”

একটু ঘুরে তাকিয়ে দেখি, ওর পেন্সিল কাটার ছুরি দিয়ে ছোট একটা গাছের ডাল কাটছে জেক। আমি আবার টলতে থাকা পানির ওপর ছিপটার দিকে নজর দিলাম।

“আমার বাবার মত বয়স জানি না হয়,” জেক বলে চলেছে, “মনে হয় আমিই আগে মারা যাব।”

“হ্যাঁ,” তাড়াতাড়ি সায় দিলাম আমি, “আমারও তাই মনে হয়।”

“এক কাজ করলে কেমন হয়? আমরা একটা ডিল করি? আমাদের বয়স চল্লিশ হয়ে গেলে আমরা একজন আরেকজনকে খুন করে ফেলব।” এক মুহূর্তের জন্য ওর হাত দুইটা থেমে গেল, “তুমি কী বলো?”

“কেটে যাবে তো।”

“কী? ওহ…” হাত থেকে ডালটা ছুঁড়ে ফেলে দিল জে। “কিন্তু একটা ব্যাপার মাথায় আসল—আমি তো তোমার চেয়ে বয়সে বড়। আমাদের অন্য কোনো প্ল্যান করা দরকার।”

জে আবারো একটা ডাল তুলে নিয়ে খুঁটতে শুরু করেছে ততক্ষণে। ওর ব্লেডের তলায় বাকল খসে পড়ছে একটু একটু করে।

“তোমার আঙুল কিন্তু কেটে যাবে এবার,” শেষ পর্যন্ত জোর দিয়ে বললাম আমি।

জে তবু কাঁধ ঝাঁকিয়ে খুঁটতেই থাকল। পানির ওপর ভেসে থাকা ছিপে র দিকে তাকালাম আমি। বিকালবেলার রোদেও আমার ঠাণ্ডা লাগছে তখন।

জে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রথম বছর চিঠি চালাচালি করেছিলাম আমরা। ও তখন বিদেশে যাওয়ার জন্য টাকা জমাতে একটা রেস্টুরেন্টে কাজ করছিল। তারপর এক সময় আমাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

বিশ বছর কেটে গেল। আমার আর জে-র সাথে দেখা হয় নাই। ওকে আবার খুঁজে বের করতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত একটা ঠিকানা পাওয়া গেল। তারপর এক সন্ধ্যাবেলায় অন্ধকার একটা বিল্ডিংয়ের ফার্স্ট ফ্লোরে গিয়ে পৌঁছালাম; নক করলাম দরজায়। জে আমাকে দেখেই চিনতে পারল, নিয়ে গেল ভেতরে।

তার বাসায় কারা যেন বেড়াতে এসেছিল, এক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা। ক্যানে করে বিয়ার খাচ্ছিল। মহিলাটা বেশ বড়সড়, প্রচুর মেক-আপ করা। আর তার প্রেমিকের বয়স মনে হল কিছুটা কম, কোটের লেপেলে ফুল পরে আছে। দু’জনই মদ খেয়ে একেবারে বুঁদ। জে-কে তাও ঠিকঠাক মনে হল। আমি ছোট ছোট করে ওর সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলাম, তবে আমার কথায় আন্তরিকতা ছিল। তারপর হুট করেই যেন অস্বস্তি বোধ করা শুরু করল জে। নিজের রুমের চারপাশে তাকাল কিছুক্ষণ, একটু পর পর চোখ ফিরিয়ে ওই প্রেমিক-প্রেমিকাকে দেখছে। একসময় প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিল সে। আমি বুঝতে পারলাম, ও আমার দিকে সহজে তাকাতে পারছে না।

একটা সাদামাটা ভাব ছাড়া ওর রুমের আর তেমন বিশেষত্ব ছিল না। চোখে পড়ার মতো ছিল কেবল পুরাতন কিছু আর্মচেয়ার আর মেটে রঙের ছোট এক কফি টেবিল। কোণায় রাখা আবছা একটা ল্যাম্প থেকেই শুধু আলো আসছিল। দেয়ালে ওয়ালপেপার আছে কিনা তাও অন্ধকারে ঠিক বোঝা যায় নাই। ওর বন্ধুরা তখনো হেসে হেসে কথা বলে চলেছে। কিন্তু জে একদম নীরব। আমিও বেশি কথা বললাম না। বেশ কয়েকবার বাইরের করিডোর থেকে পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। মাঝরাত হলে বিদায় নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো মেহমানরা। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভারি মেক আপ দেওয়া মহিলাটা বেশ জোরে চুমু দিল জে-কে। বলল, জন্মদিনটা নিশ্চয়ই খুব ভাল কেটেছে। তারপর শেষ পর্যন্ত আমরা দুই জন একা হতে পারলাম।

জে অনেক পাল্টে গেছে ততদিনে। স্বাস্থ্য ভাল হয়েছে, শরীরটা একটু নুয়ে পড়েছে সামনের দিকে। অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, গত পনের দিন নাকি ঠিকমত ঘুম হয় নাই। একটা গুদামঘরের সুপারভাইজারের চাকরি করছিল তখন। কাজ করতে কেমন লাগছে জানতে চাইলাম। বলল, চাকরিটা ভাল।

“তোমার জন্য একটা বার্থডে গিফট এনেছিলাম,” বলে ব্যাগ থেকে পার্সেলটা বের করলাম আমি। জেক নিজের চেয়ার থেকে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। এক মুহূর্তের জন্য ওর চেহারায় যেন আগ্রহের আভাস পেলাম। গিফটটা হাতে নিয়ে র‍্যাপিং না খুলেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল জে। তারপর আস্তে আস্তে পেপারটা খুলল। কালো বাক্সটা দেখে হাসল একটু। তবে বাক্সটা খুলতেই ভ্রু কপালে উঠে গেল ওর।

“এটা কীরে ভাই? বানানা নাইফ?”

“না না, তুরস্কের জিনিস। ষোলো শতকে তুর্কিরা যে ছুরি ব্যবহার করত, সেই আদলে বানানো। বিশেষ করে হাতলটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।”

“ওহ, তুরস্কের মাল।”

“তোমার তো সবসময় ওখানে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল,” বললাম আমি।

“হ্যাঁ, তা অনেক আগের ঘটনা। কোনো না কোনো সময় তো ছেলেমানুষি চিন্তাভাবনা বাদ দিতেই হয়।” জে-র মুখে হাসি। কেস থেকে ছুরিটা বের করল ও। প্রায় দুই ফুট লম্বা চমৎকার একটা অ্যান্টিক।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “পরে কি ট্রাভেলিং করা হয়েছিল?”

“অল্প কিছু দিন করেছিলাম, তাও অনেক আগে। এখন আর তাতে কিছু যায় আসে না।” আমার দিকে তাকিয়ে একটা ক্লান্ত হাসি দিল জে। তারপর সাবধানে ছুরির মাথায় আঙুল ছুঁইয়ে বললো, “তুমি কি আমাকে তাড়া করতে এসেছ, বন্ধু? বিবেকের মত?”

“আমাকে দেখে খুশি হও নাই তুমি?”

“অবশ্যই। কিন্তু তোমার বোঝা উচিৎ, এখানে সবকিছু কেমন বিষণ্ণ। চারদিকে শুধু বিষাদ আর হতাশা।” একটু হাসলো জে। “সরি, বেশি মনমরা হয়ে যাচ্ছি। আসলে রাত হয়েছে তো।”

আমি দরজার দিকে দেখিয়ে বললাম, “এ কারণেই বোধহয় রাতে ঘুমাতে পারো না তুমি। বাইরে খালি মানুষের হাঁটাচলার শব্দ।”

“আস্তে। করিডোরের ওইপাশের মহিলাটা ওর গেস্টদেরকে মাতিয়ে রাখতে পছন্দ করে। কখনো কখনো তার কাজকর্ম একেবারে গভীর রাত পর্যন্ত চলে।”

“তোমার যে বন্ধুরা এসেছিল—ওরা কি তোমার সাথে চাকরি করে নাকি?”

“আরে, বন্ধু না তো। এমনিই পরিচিত। মাঝে মাঝে বেড়াতে আসে। ও আচ্ছা, আরেকটা ব্যাপার”—সামনে ঝুঁকে পড়ে কফি টেবিল থেকে একটা চাবির গোছা হাতে নিল জে—”কে যেন ছয়-সাতদিন আগে এটা ফেলে গিয়েছিল। তোমার না নিশ্চয়ই?”

“না, আমার না।”

“যাই হোক।” চাবিগুলি নিচে রেখে দিল জে। তারপর সাবধানে ছুরিটা আবার কেসের ভেতর ঢুকিয়ে রাখল। “তুর্কি সাহিত্যের ওপর তুমি যে পেপারটা পড়েছিলা, ওইটা আমার খুব ভাল লেগেছিল। বেশ ঝরঝরে লেখা।”

“থ্যাংক ইউ। তুমি যে ওই অনুষ্ঠানে এসেছিলে তা বুঝতে পারি নাই।”

“কী বলো, আমি তো সব খবরই রাখার চেষ্টা করি। তাছাড়া, আমাদের কাজের ক্ষেত্র খুব যে আলাদা তা তো না। তাই খবর রাখার চেষ্টা করি সবসময়।”

“আমাদের কাজের জায়গা খুব একটা আলাদা না মানে? আমি একজন স্কলার, আর তুমি গুদামঘরের সুপারভাইজার।”

আবারো হাসলো জে। “তা কথাটা যেভাবে বললা, বন্ধু! কিন্তু আমি জানি তুমি ওই অর্থে বলো নাই। আমাকে নিয়ে এত টেনশন কোরো না। কফি খেলে কেমন হয়? খাবা?”

আমি সায় দিলাম। রুমের সাথে লাগোয়া ছোট রান্নাঘরটায় গিয়ে ঢুকলো জে। কাপ আর বয়ামের নাড়াচাড়ার শব্দ পেলাম কিছুক্ষণ। তারপর বেশ জোরে বললাম:

“আমরা যে একটা ডিল করেছিলাম, মনে আছে?”

“কী বললা?” জে-র গলা শোনা গেল।

“আমরা একটা চুক্তি করেছিলাম একবার, তুমি আর আমি। নদীর পাশে। আমি মাছ ধরছিলাম, তুমি আমার পিছনে বসেছিলে।”

“ও আচ্ছা। কবেকার ঘটনা জানি এইটা? তুমি কি কফিতে চিনি খাও?”

“না, চিনি দরকার নাই।” উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললাম আমি।

রুমে আসলো জে, দুই হাতে দুই কফির মগ। আমাকে দেখেই চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। আমি একদম নির্বিকারভাবে ছুরিটা ধরেছিলাম। কিন্তু আমার ভঙ্গিমায় কিছু একটা ছিল নিশ্চয়ই। টের পেয়ে গেল জে। ওর ঠোঁট দু’টা অল্প ফাঁক হলো একবার। আবার বন্ধ হলো কিছুক্ষণ পর। ওকে আর ক্লান্ত দেখাচ্ছিল না; মনে হলো কিছু সময়ের জন্য সতেরো বছরের ওই জে ফিরে এসেছে।

হয়ত পুরো এক মিনিট ধরে একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়েছিলাম আমরা। কফির কাপগুলি নামিয়ে রাখে নি জে। চেহারাটা যেন অভিব্যক্তিহীন হয়ে উঠলো ওর। এবার সব ছদ্মবেশ ঝেড়ে ফেললাম আমি। ধীরে ধীরে ছুরিটা তুলে ধরলাম উপরে।

“হ্যাঁ, এখন মনে পড়েছে,” জে’র কণ্ঠে আবেগের লেশমাত্র নেই, “তাহলে তুমি তোমার কথা রাখতে এসেছ।”

আমি কিছু না বলে শুধু এক কদম এগিয়ে গেলাম, যাতে ওর নাগাল পেতে সুবিধা হয়।

“হ্যাঁ, আমার খুব ভাল করেই মনে আছে,” জে বলে চলেছে, “আমি ভেবেছিলাম তুমি ঠিকমত শুনো নাই, মাছ ধরা নিয়ে অনেক ব্যস্ত ছিলা।” এক ঝলক হেসেই জে-র আবারো সেই ভাবলেশহীন চেহারা। “কিন্তু তোমার বয়স চল্লিশ হতে তো আরো কয়েক বছর বাকি আছে, ওল্ড ফেলো। তুমি কি চাও আমিও আমার কথা রাখি?”

“তোমার যা ভাল মনে হয়।”

“তবে তাই হোক।”

ছুরিটা মাথার ওপরে তুলে আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। রান্নাঘর থেকে আসা আলোতে ওর মুখের একপাশের গাল ও চোয়ালের হাড়গুলো চকচক করছে। আরেক পাশ ছায়ায় ঢাকা। শুধু একটা চোখ দেখা যাচ্ছে; নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি নিয়ে তাকানো। তারপর সেই চোখ ক্লান্ত হয়ে পড়ল; যেন অস্থির হয়ে উঠেছে। নিচের রাস্তা দিয়ে কোনো একটা গাড়ি চলে গেল। শেষ পর্যন্ত ছুরি চালানো শুরু করলাম আমি। কাটতে থাকলাম। পুরো সময়টায় জেক একটা শব্দও করল না। ওর হাতের কাপ থেকে কফি ছড়িয়ে পড়লো কার্পেট জুড়ে।

ডান হাতের কানি আঙুলটা বেশ যন্ত্রণা দিচ্ছে। কয়েকদিন আগে এক গ্রীক দেবীর ছোট একটা মূর্তি খোদাই করার সময় বাটালি দিয়ে আঙুলটা কেটে যায়। পরে খোদাইয়ের কাজ বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। মূর্তিটা এখনো শেষ করা হয় নি, রুমের এক কোণায় পেপারের উপর রাখা আছে। শেষ করার মতো কোনো আকাঙ্ক্ষাও কাজ করছে না অবশ্য। এর আগে ওইটার মতো আরো অনেক দেবী খোদাই করেছি আমি। এধরনের অর্জনে আর আগের মত তৃপ্তি পাই না।

আরো পড়ুন: কাজুও ইশিগুরোর গল্প ‘আ ভিলেজ আফটার ডার্ক’

গত আধাঘণ্টা ধরে কোনো পায়ের আওয়াজ শোনা যায় নাই। আমার জিউইশ প্রতিবেশী নিশ্চয়ই আজ রাতের মত তার কাজকর্ম সেরে ফেলেছে। কিন্তু আমি ঘাড়ের ওপর দিয়ে একটু পর পর পেছনে তাকিয়ে দেখছি। জে-কে দেখতে না পেয়ে স্বস্তি ও হতাশা মেশানো অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে। ও আসবে, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। শুধু চার বছর আগের সেই সাফল্যের অসারতা এখন বিব্রত করছে আমাকে। এ রুমটায় একবার চোখ ফেরালেই হবে—এসব বই, মূর্তি, আসবাব—চল্লিশ বছরের আমার সব অর্জনের দিকে এক ঝলক তাকাতে হবে কেবল। আর তারপরই জে দেখা করতে আসবে আমার সাথে। আমি জানি।

(প্রথম প্রকাশ : ১৯৮১)
অনুবাদ: আয়মান আসিব স্বাধীন

। সংযুক্তির তারিখঃ অক্টোবর ২২, ২০১৭,বিভাগঃ গল্প ,ট্যাগঃ  , মন্তব্য নেই , ৩৮ views, রেটিং করুনঃ FavoriteLoadingপছন্দের পোষ্ট হিসাবে নিন । । কাজুও ইশিগুরো- এর আরো পোষ্ট দেখুন →
Custom Search

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করার জন্য লগ ইন করুন ।

ই-মেইলের মাধ্যমে নতুন পোষ্ট-এর জন্য

আপনার ই-মেইল লিখুন

,

নভেম্বর ২৩, ২০১৭,বৃহস্পতিবার

setubondhon